Wednesday, July 9, 2014

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে রমাযানুল মুবারক

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে রমাযানুল মুবারক


মুহাম্মাদ আনসারুল্লাহ হাসান

হিজরীবর্ষের নবম মাসটির নাম রমাযানুল মুবারক। এ মাসের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য বলার অপেক্ষা রাখে না। এ মাস আল্লাহ তাআলার অধিক থেকে অধিকতর নৈকট্য লাভের উত্তম সময়, পরকালীন পাথেয় অর্জনের উৎকৃষ্ট মৌসুম। ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-আযকার এবং তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির ভরা বসন্ত। মুমিন বান্দার জন্য রমযান মাস আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নেয়ামত। তিনি এই মাসের প্রতিটি দিবস-রজনীতে দান করেছেন মুষলধারা বৃষ্টির মত অশেষ খায়ের-বরকত এবং অফুরন্ত কল্যাণ। মুমিনের কর্তব্য, এই মহা নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত হওয়া। ইরশাদ হয়েছে-

قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ

 (তরজমা) (হে নবী) আপনি বলুন! এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতেই হয়েছে। সুতরাং এতে তারা যেন আনন্দিত হয়। তারা যা কিছু সঞ্চয় করে, এটা তার চেয়ে উত্তম।-সূরা ইউনুস (১০)-৫৮

এ মাসে বান্দা পার্থিব সকল চাহিদা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর দয়া ও রহমত লাভ করবে, অতীতের সকল পাপাচার থেকে ক্ষমা চেয়ে নতুনভাবে ঈমানী জিন্দেগীর উত্তাপ গ্রহণ করবে, তাকওয়ার অনুশীলনের মাধ্যমে পুরো বছরের ইবাদত ও ইতাআতের শক্তি সঞ্চয় করবে, চিন্তা-চেতনা ও কর্ম-সাধনায় আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পিত করবে-এই হচ্ছে মুমিনের আনন্দ।

আল্লাহ তাআলা এই পবিত্র মাসকে যেসব গুণ ও মর্যাদা দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছেন, যত রহমত, বরকত এবং দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা একে মহিমান্বিত করেছেন, এ মাসের নেক আমলগুলোর যত সওয়াব ও প্রতিদান নির্ধারিত করেছেন তার হিসাব-নিকাশ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবুও কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে এবং হাদীস শরীফের বিস্তৃত বর্ণনায় যে গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট বর্ণিত হয়েছে, তার কিছু দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করার চেষ্টা করব। আল্লাহ তাআলা সবাইকে উপকৃত করুন। আমীন।

১. সিয়াম ও কিয়ামের মাস

মুসলিম উম্মাহর নিকট রমযান মাসের আগমন ঘটে প্রধানত রোযা ও তারাবীহ’র বার্তা নিয়ে। এটি রমযান মাসের বিশেষ আমল। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য, পূর্ণ নিষ্ঠা ও
আন্তরিকতার সাথে এ দুই বিষয়ে যত্নবান হওয়া। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি; যাতে তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বনকারী (মুত্তাকী) হতে পার।-সূরা বাকারা (২) ১৮৩- অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন,

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ

সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রমযান) পাবে, সে যেন অবশ্যই তার রোযা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য সময় সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে।-সূরা বাকারা-১৮৫

হযরত আবু হুরায়রা রা বলেন,

لما حضر رمضان، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : قد جاءكم رمضان، شهر مبارك، افترض الله عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب الجنة، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتغل فيه الشياطين، فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم. قال الشيخ شعيب الارنؤوط فى تعليقه على المسند : هذا حديث صحيح، وإسناد رجاله رجال الشيخين.

যখন রমযান মাসের আগন ঘটলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমাদের নিকট বরকতময় মাস রমযান এসেছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এ মাসের রোযা ফরয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শিকলে বন্দী করা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে এর কল্যান থেকে বঞ্চিত হল, সে তো প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস-৭১৪৮ সুনানে নাসায়ী-হাদীস-২৪১৬, মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৮৩৮৩ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৮৯৫৯

২. কুরআন নাযিলের মাস

রমাযানুল মুবারকের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল তা কুরআন নাযিলের মাস। এই পবিত্র মাসেই আল্লাহ তাআলা পূর্ণ কুরআন মজীদ লওহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ করেন। অতপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কুরআনের সর্বপ্রথম অহীও এ মাসেই নাযিল হয়। রমযান মাসের অন্য কোনো ফযীলত যদি উল্লেখিত না হত, তবে এই এক ফযীলতই তার মর্যাদা ও বিশেষত্বের জন্য যথেষ্ট হতো। রমযান মাসের পরিচয় ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম এই বৈশিষ্ট্যের কথাই উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

(তরজমা) রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর হক্ব-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন অবশ্যই এর রোযা রাখে।-সূরা বাকারা (২) : ১৮৫

শুধু কুরআন মজীদ নয়, হযরত ইবরাহীম আ. এর সহীফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিলসহ সকল আসমানী কিতাব এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে। তাবারানী বর্ণিত একটি সহীহ হাদীসে এই বৈশিষ্ট্যও উল্লেখিত হয়েছে।

৩. মুসলমানদের জন্য সর্বোত্তম মাস।

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ما اتى على المسلمين شهر خير لهم من رمضان ولا اتى على المنافقين شهر شرلهم من رمضان، وذلك لما يعد المؤمنون فيه من القوة للعبادة وما يعد فيه المنافقون من عفلات الناس وعوراتهم هو غنم المؤمن يغتنمه الفاجر.

قال الشيخ احمد شاكر فى تعليقه على المسند (8350) اسناده صحيح وفى (8856) اسناده حسن لغيره.

আল্লাহ তাআলার কসম! মুসলমানদের জন্য রমযানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমযান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনীমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৮৩৬৮, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস-৮৯৬৮, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস-১৮৮৪, তাবারানী হাদীস-৯০০৪, বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস-৩৩৩৫

৪. রহমতের মাস। এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।

ইতিপূর্বে উল্লেখিত একটি হাদীসে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া আরো হাদীসে তা আছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين.

যখন রমযান মাসের আগমন ঘটে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।-সহীহ বুখারী, হাদীস-১৮৯৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস-১০৭৯ (১), মুসনাদে আহমদ হাদীস-৮৬৮৪, সুনানে দারেমী, হাদীস-১৭৭৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إذا كان رمضان فتحت أبواب الرحمة، وغلقت أبواب جهنم، وسلسلت الشياطين.

وفي رواية البخاري : إذا دخل شهر رمضان، فتحت أبواب السماء ...

রমযান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়।-সহীহ মুসলিম হাদীস-১০৭৯-২

সহীহ বুখারী’র বর্ণনায় রয়েছে, রমযান আরম্ভ হলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, ...। হাদীস-১৮৯৯

মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন, মুমিন বান্দাগণ যাতে রমযান মাসের অতি মূল্যবান ও বরকতপূর্ণ সময় নেক কাজে ব্যয় করতে পারে এবং মুনাফিকদের মত খায়ের ও বরকত থেকে বঞ্চিত না থাকে, তাই আল্লাহ তাআলা এ মাসের শুরু থেকেই সৃষ্টিজগতে এমন আবহ সৃষ্টি করেন, যা পুরো পরিবেশকেই রহমত-বরকত দ্বারা আচ্ছাদিত করে দেয় এবং মুমিনদেরকে ইবাদত-বন্দেগী ও নেক আমলের উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাবে। তাদের পূণ্য ও প্রতিদানের সুসংবাদ দিতে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং পাপাচার ও খারাপ কাজ হতে বিরত রাখতে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সব ধরনের ফিতনা-ফাসাদ ও অনিষ্ট হতে রক্ষা করতে কুমন্ত্রণাদাতা দুষ্ট জ্বিন ও শয়তানদেরকে শিকল লাগিয়ে আবদ্ধ করা হয়। তারপর কল্যাণের পথে অগ্রগামী হওয়ার ও অন্যায় থেকে নিবৃত্ত থাকার আহবান জানানো হয়। যেমন আবু হুরায়রা রা. থেকেই বর্ণিত এক হাদীসে আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إذا كان أول ليلة من شهر رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن، وغلقت أبواب النار، فلم يفتح منها باب، وفتحت أبواب الجنة، فلم يغلق منها باب، وينادي منادٍ : يا باغي الخير! أقبل، ويا باغي الشر! اقصر، ولله عتقاء من النار، وذلك كل ليلة.

যখন রমযান মাসের প্রথম রাতের আগমন ঘটে, তখন দুষ্ট জ্বিন ও শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, তার একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে-হে কল্যাণের প্রত্যাশী! অগ্রসর হও, হে অকল্যাণের প্রার্থী! থেমে যাও। আর আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রতি রাতে অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দান করেন।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস ১৮৭৯৪, ৫; বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস-৩৬০১, সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৬৮২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৬৪২ মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস-১৫৭২ মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস-৮৯৬০

৫. জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস এবং দুআ কবুলের মাস

পূর্বের হাদীসেই বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রতি রাত্রে অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দান করেন। সুতরাং আমাদের কর্তব্য, বেশি বেশি নেক আমল এবং তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেদেরকে এই শাহী ফরমানের অন্তর্ভুক্ত করা।

এ প্রসঙ্গে অন্য হাদীসে হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إن لله عند كل فطر عتقاء، وذلك في كل ليلة.

وقال البوصيري : رجال إسناده ثقات

অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমযান মাসে প্রতি ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। প্রতি রাতেই তা হয়ে থাকে।-সুনানে ইবনে  মাজাহ, হাদীস-১৬৪৩, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-২২২০২, তবারানী হাদীস-৮০৮৮. বায়হাকী-৩৬০৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. অথবা আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إن لله عتقاء في كل يوم وليلة (يعني في رمضان) لكل عبد منهم دعوة مستجابة.

قال الشيخ شعيب الارنؤوط : وإسناده صحيح على شرط الشيخين.

অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমযান মাসের প্রত্যেক দিবস ও রাত্রিতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দুআ কবুল করেন। -মুসনাদে আহমদ হাদীস ৭৪৫০, মুসনাদে বাযযার, হাদীস-৯৬২

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إن لله في كل يوم وليلة عتقاء من النار في شهر رمضان، وإن لكل مسلم دعوة يدعو بها فيستجاب له.

وقال الهيثمى فى المجمع : رواه البزار، ورجاله ثقات.

রমযান মাসের প্রতিটি দিবস ও রজনীতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম  থেকে মুক্তি দান করেন। প্রত্যেক মুসলিমের একটি দুআ, যা সে করে, কবুল করা হয়।-মুসনাদে বায্যার, হাদীস ৩১৪১, মাযমাউয যাওয়াইদ, ১৭২১৫

৬. দানশীলতার মাস

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন,

كان رسول الله صلى الله عيله وسلم أجود الناس، وكان أجود ما يكون في رمضان، حين يلقاه جبريل، وكان يلقاه في كل ليلة من رمضان فيدارسه القرآن، فلرسول الله صلى الله عليه وسلم أجود بالخير من الريح المرسلة.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তাঁর দানশীলতা (অন্য সময় হতে) অধিকতর বৃদ্ধি পেত রমযান মাসে, যখন জিব্রীল আ. তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন। জিব্রীল আ. রমযানের প্রতি রাত্রে আগমন করতেন এবং তাঁরা পরস্পর  কুরআন শুনাতেন। তো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল।-সহীহ বুখারী, হাদীস-৬, সহীহ মুসলিম হাদীস-২৩০৮, মুসনাদে আহমদ, ২৬১৬

হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আলজুহানী রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

من فطر صائما كان له مثل أجره، غير أنه لا ينقص من أجر الصائم شيئًا.

قال الترمذى : هذا حديث حسن صحيح.

যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (রোযাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভ করবে। তবে রোযাদারের প্রতিদান হতে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না।-সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৮০৭, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-১৭০৩৩, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৭৪৬, সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস-৩৪২৯, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস-২০৬৪

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

من فطر صائما أطعمه وسقاه كان له مثل أجره.

رواه عبد الرزاق في مصنفه : وهو في حكم المرفوع، فمثله لا يعرف بالرأي،

যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে পানাহার করিয়ে ইফতার করাবে, সে তার অনুরূপ সওয়াব লাভ করবে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হাদীস-৭৯০৬

৭. আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধির মাস

রমযান মাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এ মাস মুমিনের নেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধির মাস এবং আখেরাতের সওদা করার শ্রেষ্ঠ সময়। দুনিয়ার ব্যবসায়ীদের যেমন বিশেষ বিশেষ মৌসুম থাকে, যখন খুব জমজমাট ব্যবসা হয় এবং বছরের অন্য সময়ের তুলনায় আয়-উপার্জন ও মুনাফা বেশি হয়, তেমনি আখেরাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার শ্রেষ্ঠ মওসুম হচ্ছে রমযান মাস। এ মাসে আমলের দ্বারা অনেক বেশি মুনাফা লাভ করা যায়। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-

عن ابن عباس رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لامرأة من الأنصار، سماها ابن عباس فنسيت اسمها (وفي الرواية الأخرى : يقال لها أم سنان)، ما منعك أن تحجي معنا؟ قالت : لم يكن لنا إلا ناضحان، فحج أبو ولدها وابنها على ناضح وترك لنا ناضحا ننضح عليه، قال : إذا جاء رمضان فاعتمري، فإن عمرة فيه تعدل حجة.

وفي رواية أخرى لمسلم : فعمرة في رمضان تقضي حجة أو حجة معي.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারী মহিলাকে বললেন, বর্ণনাকারী বলেন, তার নাম ইবনে আববাস রা. উল্লেখ করেছিলেন কিন্তু আমি তা ভুলে গিয়েছি-(অন্য বর্ণনায় তার নাম উম্মে সিনান উল্লেখ করা হয়েছে) তুমি কেন আমাদের সাথে হজ্ব করতে যাওনি? তিনি বললেন, আমাদের পানি বহনকারী দুটি মাত্র উট রয়েছে। একটিতে আমার ছেলের বাবা (স্বামী) ও তাঁর ছেলে হজ্ব করতে গিয়েছেন, অন্যটি পানি বহনের জন্য আমাদের কাছে রেখে গিয়েছেন। তিনি বলেন, রমযান মাস এলে তুমি উমরা করবে। কেননা এ মাসের উমরা একটি হজ্বের সমতুল্য। সহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রমযান মাসের উমরা একটি হজ্বের সমতুল্য। অথবা বলেছেন, আমার সাথে একটি হজ্বের সমতুল্য (সওয়াবের হিসাবে)।-সহীহ বুখারী, হাদীস, ১৭৮২, সহীহ মুসলিম-১২৫৬, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-২০২৫

হযরত উম্মে মাকিল রা. হতে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

عمرة في رمضان تعدل حجة.

رواه الترمذي في سننه، وقال : حديث أم معقل حديث حسن غريب، ورواه أبو داود، وفي رواية أحمد عن أم معقل الأسدية، أنها قالت : يا رسول الله صلى الله عليه وسلم! إني أريد الحج وجملي أَعْجَفُ، فما تأمرني، قال : اعتمري في رمضان، فإن عمرة في رمضان تعدل حجة.

রমযান মাসে উমরা হজ্বের সমতুল্য। -সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৯৩৯, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৯৮৬।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, উম্মে মাকিল রা. বলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো হজ্ব করতে ইচ্ছুক। কিন্তু আমার উটটি দুর্বল। তিনি বললেন, তুমি রমযান মাসে উমরা করো। কেননা রমযান মাসে উমরা (সওয়াব হিসেবে) হজ্বের সমতুল্য। মুসনাদে আহমদ, হাদীস ২৭২৮৫

৮. পাপ মোচন ও গুনাহ থেকে ক্ষমা লাভের মাস

হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন-

الصلوات الخمس والجمعة إلى الجمعة ورمضان إلى رمضان مكفرات ما بينهن، إذا اجتنب الكبائر.

পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ এবং এক রমযান থেকে আরেক রমযান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহকে মুছে দেয় যদি সে কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৩ (৩)

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রমযান মাস হল মাগফিরাত লাভের মাস, যে মাসে সকলের জন্য ক্ষমার দুয়ার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ক্ষমা লাভের এমন সূবর্ণ সুযোগ পেয়ে যে ব্যক্তি নিজের পাপসমূহ ক্ষমা করাতে পারে না সে সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত। হাদীস শরীফে তার জন্য বদ দুআ করা হয়েছে।

হযরত কা’ব ইবনে উজরা রা. হতে ব©র্ণত, তিনি বলেন-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : احضروا المنبر، فحضرنا، فلما ارتقى درجة قال آمين، فلما ارتقى الدرجة الثانية قال آمين، فلما ارتقى الدرجة الثالثة قال آمين، فلما نزل، قلنا : يا رسول الله! لقد سمعنا منك اليوم ما كنا نسمعه، قال : إن جبريل عرض لي فقال : بعد من أدرك رمضان فلم يغفر له، قلت : أمين، فلما رقيت الثانية، قال : بعد من ذكرت عنده فلم يصل عليك، قلت : آمين، فلما رقيت الثالثة، قال : بعد من أدرك أبويه الكبير أو أحدهما فلم يدخلا الجنة، قلت : آمين.

رواه الحاكم، وقال : صحيح الإسناد، واورده الهيثمى فى المجمع وقال : رواه الطبرانى ورجاله ثقات.

একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা মিম্বরের নিকট সমবেত হও। আমরা সকলেই তথায় উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বরের প্রথম সিড়িতে পা রাখলেন, তখন বললেন, আমীন, যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন, যখন তিনি তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন।

হযরত কা’ব ইবনে উজরা রা. বলেন, যখন তিনি (মিম্বর থেকে) অবতরণ করলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমরা (মিম্বরে উঠার সময়) আপনাকে এমন কিছু কথা বলতে শুনেছি, যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। উত্তরে তিনি বললেন, জিব্রীল আ. আমার নিকট আগমন করেছিলেন, যখন আমি প্রথম সিড়িতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে রমযান মাস পেল, তবুও তার গুনাহ মাফ হল না। আমি বললাম, আমীন। যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলাম তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যার নিকট আপনার নাম উচ্চারিত হল অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ পড়ল না। আমি বললাম আমীন। যখন তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে বৃদ্ধ পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তারা উভয়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না। অর্থাৎ তাদের খেদমতের মাধ্যমে নিজেকে জান্নাতবাসী করতে পারল না। আমি বললাম, আমীন। মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস - ৭৩৩৮, মাযমাউয যাওয়াইদ, হাদীস-১৭৩১৭

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকেও এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। দেখুন : আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৬৪৬, মুসনাদে আহমদ, হাদীস-৭৪৫১, সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস-১৮৮৮, সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৩৫৪৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৫৫১

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,

أول ما يصيب صاحب رمضان الذي يحسن قيامه وصيامه أن يفرغ منه وهو كيوم ولدته من الذنوب.

রমযান মাস লাভকারী ব্যক্তি-যে উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম (রোযা, তারাবী ও অন্যান্য আমল) পালন করে-তার প্রথম পুরস্কার এই যে, সে রমযান শেষে গুনাহ থেকে ঐ দিনের মতো পবিত্র হয় যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল।-মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদীস-৮৯৬৬

৯. লাইলাতুল কদরের মাস

আল্লাহ রাববুল আলামীনের পক্ষ হতে মুসলিম উম্মাহর জন্য আরেকটি বিশেষ দান হল এক হাজার রাত অপেক্ষা উত্তম লাইলাতুল কদর। এই রাত এত মর্যাদাশীল ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে, এক হাজার রাত ইবাদত করলে যে সওয়াব হতে পারে, এই এক রাতের ইবাদতে তার চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

আল্লাহ তাআলা এ রাত সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন-

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ  تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ  سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ

 (তরজমা) লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিব্রীল আ.) তাদের পালনকর্তার আদেশক্রমে প্রত্যেক কল্যাণময় বস্ত্ত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরন করেন। যে রাত পুরোটাই শান্তি, যা ফযর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।-সূরা কদর (৯৭) : ৩-৫

এই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়া চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়।

হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. বর্ণনা করেন-

دخل رمضان، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن هذا الشهر قد حضركم، وفيه ليلة خير من ألف شهر، من حرمها فقد حرم الخير كله، ولا يحرم خيرها إلا محروم.

قال المنذري : إسناده حسن، إن شاء الله، وكذا قاله البوصيري.

রমযান মাসের আগমন ঘটলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের নিকট এই মাস সমাগত হয়েছে, তাতে এমন একটি রাত রয়েছে, যা এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যান থেকে বঞ্চিত হল, সে প্রকৃতপক্ষে সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত। একমাত্র (সর্বহারা) দুর্ভাগাই এ রাতের কল্যান থেকে বঞ্চিত হয়।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৬৪৪

তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে এ রাতের খায়ের-বরকত লাভে সচেষ্ট থাকা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

হাদীছের অনুবাদ ও ভাষ্য প্রণয়নে ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা

হাদীছের অনুবাদ ও ভাষ্য প্রণয়নে ভারতীয় উপমহাদেশের

আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা


মূল (উর্দূ) : মাওলানা মুহাম্মাদ ইসহাক ভাট্টি

অনুবাদ : নূরুল ইসলাম

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাসমূহে (প্রবন্ধে) কুরআন মাজীদের অনুবাদ ও তাফসীরে ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকার কথা সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন হাদীছে তাঁদের অগ্রণী ভূমিকার কথা আলোচনা করছি। তবে তার পূর্বে কিছু যরূরী কথা লক্ষণীয়।

উপমহাদেশের অগণিত আলেম সবিশেষ গুরুত্বের সাথে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছের খিদমত করেছেন এবং করছেন। কেউ দরস-তাদরীসের (পাঠদান) মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালনের দৃঢ় সংকল্প করেছেন। কেউ বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও টীকা-টিপ্পনী লিপিবদ্ধ করার প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। কেউ কোন গ্রন্থের উর্দূ বা অন্য কোন ভাষায় অনুবাদ করা আবশ্যক মনে করেছেন। কেউ হাদীছের তাখরীজকে গবেষণার বিষয় নির্ধারণ করেছেন এবং কেউ হাদীছের প্রকার সমূহ ব্যাখ্যা করেছেন। হাদীছের খিদমতের এ পদ্ধতি সমূহ অত্যন্ত গুরুত্ববহ। বিশেষত আহলেহাদীছ আলেমগণ এই মর্যাদাপূর্ণ কাজের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং তাদের প্রচেষ্টার বদৌলতে হাদীছের জ্ঞান সমূহের প্রচার-প্রসারের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত হয়। অতঃপর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয় যে, এ ব্যাপারে তাদের দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতার কারণে এটি একটি বিশাল বড় আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। শায়খ মুহাম্মাদ মুনীর দামেশকী যাকে ‘একটি বড় পুনর্জাগরণ’ (نهضة عظيمة) বলে বর্ণনা করছেন। আর এর বর্ণনা দিতে গিয়ে হিজরী চতুর্দশ শতকের মিসরের খ্যাতিমান গ্রন্থকার ও মুহাক্কিক আল্লামা রশীদ রিযা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন-

لولا عناية إخواننا علماء الهند فى هذا العصر لقضى عليها بالزوال من أمصار الشرق، فقد ضعف فى مصر والشام والعراق والحجاز منذ القرن العاشر للهجرة حتى بلغت منتهى الضعف فى أوائل هذا القرن الرابع عشر.

‘যদি এই যুগে আমাদের ভারতীয় আহলেহাদীছ ভাইগণ হাদীছের ব্যাপারে গুরুত্ব না দিতেন, তাহলে প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তা বিলুপ্ত হয়ে যেত। কারণ হিজরী দশম শতক থেকেই মিসর,  সিরিয়া,  ইরাক ও হিজাযে উহার চর্চা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল এবং চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে তা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল’।[1]

সত্যের স্বীকৃতি :

উপমহাদেশের আলেমগণ হাদীছের প্রচার ও প্রসারের জন্য যে সীমাহীন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, আল্লামা রশীদ রিযা ছাড়াও আরব বিশ্বের আরো অনেক মুহাক্কিক আলেম তার বর্ণনা দিয়েছেন। খোদ ভারতের প্রসিদ্ধ হানাফী আলেম মাওলানা মানাযির আহসান গীলানী স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন যে, এই বিষয়ে মৌলিক কাজ আহলেহাদীছ আলেমগণই করেছেন। মাওলানা বলছেন- ‘এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, দ্বীনের মৌলিক উৎস সমূহের (কুরআন ও হাদীছ) দিকে ভারতীয় হানাফী মুসলমানদের প্রত্যাবর্তনে আহলেহাদীছ ও গায়ের মুক্বাল্লিদদের আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে। সাধারণ জনগণ গায়ের মুক্বাল্লিদ হয়নি বটে, তবে গোঁড়া তাক্বলীদ ও অন্ধ অনুকরণের ভেল্কিবাজি অবশ্যই ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে’।[2]

হানাফী জামা‘আতেরই একজন বুযুর্গ মাওলানা সাইয়িদ রশীদ আহমাদ আরশাদের ‘হিন্দ ও পাকিস্তান মেঁ ইলমে হাদীছ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ মাসিক ‘আল-বালাগ’-এ (করাচী) প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন- ‘শেষ যামানায় হাদীছের পাঠদান ও প্রচার-প্রসারের ফলে ভারতবর্ষে আহলেহাদীছ নামে একটি ফের্কা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। যারা ইমামদের তাক্বলীদ করার বিরোধিতা করত। এর ফলে হানাফী আলেমদের মধ্যেও হাদীছের গ্রন্থাবলী অধ্যয়নের আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং তারা ফিকহী মাসআলাগুলোকে হাদীছের আলোকে প্রমাণ করার প্রতি মনোযোগী হয়। এভাবে এই ফের্কার অস্তিত্ব ইলমে হাদীছের অগ্রগতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়’।[3]

এই লাইনগুলোতে প্রবন্ধকার মাযহাবী গোঁড়ামিবশত আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে বিষোদগারের যে বিষাক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তাতো একেবারেই সুস্পষ্ট। আমরা এখন এর প্রতিবাদ করতে চাচ্ছি না। এখানে শুধু এটা পেশ করা উদ্দেশ্য যে, আহলেহাদীছদের কঠিন বিরোধিতাকারীও এই সত্য স্বীকার করতে বাধ্য যে, উপমহাদেশে আহলেহাদীছগণই নবী করীম (ছাঃ)-এর হাদীছের প্রকৃত মুবাল্লিগ। হানাফীরা আহলেহাদীছদেরকে দেখে এই বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হয় এবং এটাও স্রেফ কাটছাঁট করে হাদীছ থেকে নিজেদের কতিপয় ফিকহী মাসআলা প্রমাণ করার জন্য। মাশাআল্লাহ তারা এই কল্যাণকর কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

আহলেহাদীছ কোন ফের্কা নয় :

ঘটনাসমূহের আলোকে যদি দেখা যায় তাহলে আহলেহাদীছ ভারতবর্ষে সৃষ্ট কোন ফের্কা নয়। বরং ইসলামের ইতিহাস আমাদেরকে অবগত করে যে, এই ভূখন্ডের লোকজন হিজরী প্রথম শতকেই ইসলামের সাথে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল এবং তারা নবী করীম (ছাঃ)-এর নির্দেশ সমূহের সংবাদ পেতে শুরু করেছিল। কারণ হযরত ওমর ফারূক (রাঃ)-এর কল্যাণকর যুগে (১৫ হিঃ) এই ভূখন্ডে ছাহাবায়ে কেরামের আগমন শুরু হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের শুভাগমনও এখানে হয়েছিল। এই পুণ্যবান জামা‘আতের মর্যাদাবান সদস্যগণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছ নিজেদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা এখানে যার তাবলীগ করেন এবং এই ভূখন্ডের বাসিন্দারা সেগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়। এরই ফলশ্রুতিতে বহু জায়গায় ‘ক্বালাল্লাহ’ ও ‘ক্বালার রাসূল’ (অর্থাৎ কুরআন ও হাদীছ)-এর মর্মস্পর্শী ধ্বনি গুঞ্জরিত হতে শুরু করে। কিন্তু বর্তমান যুগের ন্যায় ঐ সময় জনবসতি এত নিকটে ছিল না এবং মানুষজনের মধ্যে যোগাযোগও ছিল না। মনুষ্যবসতির পরিধি ছিল সীমাবদ্ধ এবং লোকজন পরস্পর থেকে দূর-দূরান্তে বসবাস করত। লেখালেখির কোন উল্লেখযোগ্য মাধ্যম ছিল না এবং সেই সময় এই অঞ্চল সমূহে গ্রন্থ রচনারও কোন প্রচলন ছিল না। মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং কোথাও ছাপাখানার চিহ্ন পাওয়া যেত না। লেখাপড়া এবং হাদীছের পাঠ গ্রহণ ও প্রদানের পরিধি খুবই সংকীর্ণ ছিল। তবে যতটুকু ছিল তা ছিল প্রভাব বিস্তারকারী এবং এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে শুরু করে।

হাদীছ প্রসারের ঢেউ :

হিজরী তের ও চৌদ্দ শতকে সারা পৃথিবীতে উন্নতি-অগ্রগতির ঢেউ উঠে এবং শিক্ষার প্রচলনও ব্যাপক হয়। বিপুলসংখ্যক মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, গ্রন্থ রচনার জন্য পরিবেশ অনুকূল হয়, প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গ্রন্থসমূহের প্রকাশনাও ব্যাপক হওয়া শুরু করে। উপমহাদেশের মানুষদের উপরও এর প্রভাব পড়ে এবং নিজ নিজ ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী তারা কাজে নিমগ্ন হয়। এই সময়ে (হিজরী দ্বাদশ শতক) শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভীর প্রচার ও লেখনীর মহোদ্যম প্রসিদ্ধি লাভ করে। অতঃপর তাঁর সম্মানিত পুত্রগণ (শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ, শাহ রফীউদ্দীন ও শাহ আব্দুল কাদের) ও এঁদের ছাত্রদের পাঠদান ও গ্রন্থ রচনার খিদমতের এক সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। মাওলানা ইসমাঈল শহীদ, মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভী, নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান, মাওলানা শামসুল হক ডিয়ানবী আযীমাবাদী, মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, মাওলানা হাফেয আব্দুল্লাহ গাযীপুরী, মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম আরাভী, হাফেয মুহাম্মাদ লাক্ষাবী, সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভী, সাইয়িদ আব্দুল জাববার গযনভী, মাওলানা হাফেয আব্দুল মান্নান ওয়াযীরাবাদী এবং অন্যান্য অসংখ্য উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন আলেম এই সোনালী-পরম্পরার উজ্জ্বল মুক্তাদানায় পরিণত হন। আল্লাহ তাঁদের প্রতি রহম করুন! ভূমিকামূলক এসব কথার পর সামনে চলুন!

ইলমে হাদীছে শাহ অলিউল্লাহ দেহলভীর খিদমত :

শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী কুরআন সম্পর্কে যে খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, সম্মানিত পাঠকবৃন্দ তা পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা সমূহে (প্রবন্ধে) অবগত হয়েছেন। অবস্থানুযায়ী স্বীয় যুগে নবী করীম (ছাঃ)-এর হাদীছেরও তিনি সীমাহীন খিদমত করেছেন। হিজাযের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষকদের নিকট তিনি হাদীছ অধ্যয়ন করেন এবং এ সম্পর্কিত জ্ঞান সমূহে গভীর পান্ডিত্য হাছিল করেন। এরপর ভারতে ফিরে এসে এই মৌলিক জ্ঞানকে অধিকতর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন। ইতিপূর্বে উপমহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মূলত ইলমে হাদীছের খুব একটা বেশী প্রচলন ছিল না। এজন্য তিনি এই জ্ঞানের (হাদীছ) প্রচার-প্রসারকে তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন। এর জন্য তিনি পাঠদান ও গ্রন্থ রচনা উভয় খিদমতই আঞ্জাম দেন।

লেখনীর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান হল তিনি মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেকের দু’টি শরাহ বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন। এটি হাদীছের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ। এর বিন্যাস ও রচনাশৈলী দ্বারা শাহ ছাহেব খুবই প্রভাবিত ছিলেন। তিনি এটিকে হাদীছের মূল ও ভিত্তি বলে আখ্যায়িত করতেন। এজন্য তিনি ‘আল-মুছাফফা’ (المصفَّى) নামে এর আরবী শরাহ লেখেন। ঐ সময় ভারতবর্ষে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলোতে ফার্সী ভাষার প্রচলন বেশী থাকায় তিনি ফার্সীতেও এর একটি শরাহ লিখেন। তিনি এর নামকরণ করেন ‘আল-মুসাওয়া’ (المسوَّى)।

তাছাড়া ছহীহ বুখারীর অধ্যায় শিরোনামের ব্যাখ্যা সম্বলিত ‘শারহু তারাজুমি আবওয়াবি ছহীহিল বুখারী’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। অতঃপর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ লিপিবদ্ধ করেন। যেটি শরী‘আতের নিগূঢ় তত্ত্ব ও ইসলামী বিধি-বিধান সমূহের দার্শনিক ব্যাখ্যা সম্বলিত একটি বড় ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এই গ্রন্থের বৃহদাংশ বিষয় হাদীছের উপর ভিত্তিশীল। এটি অধ্যয়ন করলে জানা যায় যে, শাহ ছাহেব ইলমে হাদীছে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি উপমহাদেশে ইলমে হাদীছের এমন খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, ইতিপূর্বে এই ভূখন্ডের কোন আলেমের কল্পনাতেও কখনো যা আসেনি।

লেখনী ছাড়া এই ভূখন্ডে শাহ ছাহেব পাঠদানেরও এক ব্যাপক সিলসিলা জারি করেছিলেন। অসংখ্য জ্ঞানান্বেষী তাঁর নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করে। অতঃপর এই পরম্পরা সামনে এগুতে থাকে এবং এখনও এগুচ্ছে। ইনশাআল্লাহ এগুতে থাকবে। এর প্রভাব উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে অন্যান্য দেশসমূহেও গিয়ে পৌঁছে। বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষ এখানে আসে এবং এই দেশের বিভিন্ন শিক্ষকের নিকট থেকে হাদীছ পড়ে।

শাহ ছাহেবের সম্মানিত পুত্রগণ :

শাহ অলিউল্লাহর পরে তাঁর সম্মানিত পুত্রগণও পাঠদান ও গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে ইলমে হাদীছের প্রসারের জন্য সীমাহীন প্রচেষ্টা চালান। শাহ আব্দুল আযীয ফার্সী ভাষায় ‘বুসতানুল মুহাদ্দিছীন’ নামে মুহাদ্দিছগণের জীবনী সম্বলিত একটি গ্রন্থ লিখেন। এর পূর্বে এই বিষয়ে ভারতবর্ষে কোন ভাষাতেই কোন গ্রন্থ ছিল না। তিনি আরো অনেক সুন্দর সুন্দর গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই চার ভাই (শাহ আব্দুল আযীয, শাহ রফীউদ্দীন, শাহ আব্দুল কাদের ও শাহ আব্দুল গণী) পাঠদানের মাধ্যমেও লোকজনের অনেক উপকার সাধন করেছেন।

নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান :

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা সমূহে (প্রবন্ধে) সংক্ষিপ্তাকারে নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খানের কুরআনী খিদমত সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। হাদীছ সম্পর্কে আরবী, ফার্সী, উর্দূ তিন ভাষাতেই তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। হাদীছ সম্পর্কে আরবীতে তাঁর অনেকগুলো গ্রন্থ রয়েছে। তন্মধ্যে কতিপয় গ্রন্থ হ’ল:-

১. আওনুল বারী লিহাল্লি আদিল্লাতিল বুখারী ২. আস-সিরাজুল ওয়াহ্হাজ ফী কাশফি মাতালিবি মুসলিম বিন হাজ্জাজ ৩. ফাতহুল আল্লাম শারহু বুলূগুল মারাম ৪. আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ আস-সিত্তাহ ৫. আর-রাওযুল বাসসাম মিন তারজামাতি বুলূগুল মারাম ও মুওয়াল্লিফিহিল ইমাম ৬. নুযুলুল আবরার বিল ইলমিল মা’ছূর ফিল আদ‘ইয়্যাহ ওয়াল আযকার ৭. আর-রহমাতুল মুহদাত ইলা মাইঁ য়ুরীদু যিয়াদাতাল ইলম আলা আহাদীছিল মিশকাত ৮. আল-ইবরাতু বিমা জাআ ফিল গাযবি ওয়াশ শাহাদাতি ওয়াল হিজরাহ। এসব গ্রন্থ ছাড়াও আরবীতে এ বিষয়ে তাঁর রচনাবলী রয়েছে।

ফার্সীতে নওয়াব ছাহেবের হাদীছ সম্পর্কিত কতিপয় গ্রন্থ হ’ল : ১. সিলসিলাতুল আসজাদ ফী মাশায়িখিস সিন্দ ২. মিসকুল খিতাম শারহু বুলূগুল মারাম ৩. মানহাজুল উছূল ইলা ইছতিলাহি আহাদীছির রাসূল ৪. মাওয়াইদুল আওয়াইদ মিন উয়ূনিল আখবার ওয়াল ফাওয়াইদ।

এখন হাদীছ সম্পর্কে উর্দূতে রচিত নওয়াব ছাহেবের কতিপয় গ্রন্থের নাম পড়ুন! ১. বুগয়াতুল কারী ফী তারজামাতি ছুলাছিয়্যাতিল বুখারী ২. ইত্তিবাউল হাসানাহ ফী জুমলাতি আইয়্যামিস সানাহ ৩. তামীমাতুছ ছাবী ফী তারজামাতি আহাদীছিন নবী ৪. তাওফীকুল বারী লিতারজামাতিল আদাব আল-মুফরাদ লিল-বুখারী ৫. গুনইয়াতুল কারী ফী তারজামাতি ছুলাছিয়্যাতিল বুখারী ৬. মাহাসিনুল আ‘মাল ৭. যূউশ শামস ফী শারহি হাদীছি বুনিয়াল ইসলামু আলা খামস। উর্দূতে হাদীছ বিষয়ে তাঁর আরো অনেক গ্রন্থ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে অনেক গুণে গুণান্বিত করেছিলেন।

হাফেয মুহাম্মাদ লাক্ষাবী লিখিত হাশিয়া সমূহ :

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাসমূহে (প্রবন্ধে) হাফেয মুহাম্মাদ লাক্ষাবীকৃত কুরআনের ফার্সী ও পাঞ্জাবী অনুবাদ এবং ‘তাফসীরে মুহাম্মাদী’র বর্ণনা এসে গেছে। হাফেয ছাহেব আরবীতে সুনানে আবুদাঊদ ও মিশকাতের হাশিয়া লিখেছেন। তিনিই ছিলেন প্রথম পাঞ্জাবী আলেম, যিনি আরবীতে এই খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। মাওলানা শামসুল হক আযীমাবাদী যখন আবুদাঊদের ভাষ্য ‘আওনুল মা‘বূদ’ লিখছিলেন, তখন তিনি হাফেয মুহাম্মাদ লাক্ষাবীকৃত আবুদাঊদের হাশিয়া দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন। এর অর্থ হল তিনি মাওলানা আযীমাবাদীর পূর্বে এই খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। ১২৭১ হিজরীতে তিনি আবুদাঊদের হাশিয়া লিখেন এবং ১২৭২ হিজরীতে তা মুদ্রিত হয়। মিশকাতের হাশিয়া লিখেন ১২৭২ হিজরীতে, যা ঐ বছরই প্রকাশিত হয়। এর মানে হল উপমহাদেশের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলোতে হাফেয ছাহেবের গবেষণাপূর্ণ লেখনীগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হত।

গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনায় গযনভী আলেমদের খিদমত :

সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভী[4] উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ছিলেন।  তিনি  ১২৩০  হিজরীতে  (১৮১৫ খ্রিঃ)  আফগানিস্তানের গযনী যেলার ‘বাহাদুর খায়ল’ দুর্গে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় যুগের খ্যাতনামা আলেমদের কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন। দিল্লী গিয়ে মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভীর কাছে ছহীহ বুখারী পড়েন। অত্যন্ত মুত্তাক্বী আলেম এবং নিজ জন্মভূমি আফগানিস্তানে তাওহীদ ও সুন্নাতের অনেক বড় মুবাল্লিগ ছিলেন। বিদ‘আত ও শিরকী রসম-রেওয়াজের ঘোর বিরোধী ছিলেন। আফগানিস্তানের দুষ্টু আলেমগণ এই মৌলিক বিষয়ে তাঁর কঠিন বিরোধিতা করে এবং তদানীন্তন সরকারকে বলে যে, এই ব্যক্তি দেশে ফিতনা ছড়াচ্ছে। এজন্য তাকে শাস্তি দেয়া হোক। সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে কঠিনভাবে প্রহার করে এবং তিনপুত্র মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ গযনভী, মাওলানা সাইয়িদ আব্দুল্লাহ ও মাওলানা সাইয়িদ আব্দুল জাববার গযনভী সহ তাঁকে জেলখানায় বন্দী করে।[5]

কঠিনতম শাস্তি প্রদানের পর আফগানিস্তান সরকার সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভী এবং তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। দেশ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এই পুণ্যবান লোকগুলো বিভিন্ন স্থান ঘুরেফিরে পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে পৌঁছেন এবং সেখানে তাঁরা মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করেন। যেটি ‘মাদরাসা গযনভিয়াহ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। কুরআন-হাদীছ সম্পর্কে তাঁরা নিজেরাও গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেন এবং পুরনো গ্রন্থগুলো প্রকাশও করেন। যার মধ্যে ইমাম ইবনু তাইমিয়া ও ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িমের গ্রন্থগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হাদীছ সম্পর্কিত অসংখ্য গ্রন্থ এঁদেরই প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো প্রকাশনার মুখ দেখে। সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভী ১২৯৮ হিজরীর ১৫ই রবীঊল আওয়াল (১৫ই ফেব্রুয়ারী ১৮৮১ খ্রিঃ) অমৃতসরে মৃত্যুবরণ করেন।

নিম্নে এই পরিবারের আলেমদের গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনা সংক্রান্ত যাবতীয় খিদমতের বর্ণনা পেশ করা হচ্ছে। যার মধ্যে কুরআনী খিদমতও শামিল রয়েছে। তাঁদের সব খিদমতকে একত্রিত করে দেয়া হয়েছে।

যখন সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভী আফগানিস্তান থেকে হিজরত করে ভারতে আসেন, তখন তার ১২ পুত্র ও ১৫ কন্যা ছিল। এক ছেলের নাম ছিল আব্দুল্লাহ। হিজরতের সময় এদের অধিকাংশই তাঁর সহযাত্রী হয়ে এখানে আসে। এখানকার আবহাওয়া কারো কারো অনুকূলে হয়নি বিধায় তারা এদেশে আসার পর খুব বেশী দিন বাঁচেনি। এঁরা সকলেই কুরআন ও হাদীছে অভিজ্ঞ আলেম, মুবাল্লিগ ও শিক্ষক ছিলেন। এঁদের গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনাগত খিদমতের তালিকা নিম্নরূপ:

১. তাফসীরে জামেউল বায়ান মা‘আ হাশিয়া জামেউল বায়ান : এটি (জামেউল বায়ান ওরফে তাফসীরে তাবারী) কুরআন মাজীদের প্রসিদ্ধ এবং আলেমদের মধ্যে প্রচলিত তাফসীর। মাওলানা আব্দুল্লাহ গযনভীর জ্যেষ্ঠপুত্র মাওলানা মুহাম্মাদ গযনভী এর হাশিয়া লিখেন। মাওলানা মুহাম্মাদ গযনভীর হাশিয়া সহ এই তাফসীরটি ১৮৯২ সালে দিল্লীর ফারূকী প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। এই তাফসীরের সাথে নিম্নোক্ত তেরটি গ্রন্থের সারনির্যাস প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয় :

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতীর ইকলীল ফী ইসতিমবাতিত তানযীল ও মুফহিমাতুল আকরান ফী মুবহামাতিল কুরআন, ইমাম ইবনু তাইমিয়ার তাফসীর সুরাতুন নূর, ফাওয়াইদ শারীফিয়্যাহ, ফুতয়া ফী মাসআলাতি কালামিল্লাহি তা‘আলা, রিসালাহ ফিল কুরআন, কাইদাহ ফিল কুরআন, তাফসীর সম্পর্কিত বিভিন্ন ফায়েদা সংবলিত গ্রন্থ ‘ফাওয়াইদ শাত্তা’, খাতিমাতুত তাবইল মুশতামালাহ আলাল ফাওয়াইদ আল-মুবহামাহ, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের কিতাবুর রাদ্দ আলাল জাহমিয়্যাহ, শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভীর আল-ফাওযুল কাবীর ফী উছূলিত তাফসীর, আহাদীছুত তাওহীদ ওয়া রাদ্দুশ শিরক ও আসবাবুল ইহতিরায মিনাশ শায়তান।

২. হামায়েলে গযনভিয়াহ : এটা ঐ গযনভী হামায়েল (ছোট কুরআন শরীফ), যার অনুবাদ ও টীকা নওয়াব ওয়াহীদুয্যামান খান লিখিত। এটি মাওলানা আব্দুল্লাহ গযনভীর পৌত্র এবং মাওলানা মুহাম্মাদ গযনভীর পুত্র মাওলানা আব্দুল আওয়াল গযনভী আল-কুরআন ওয়াস সুন্নাহ প্রেস, অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন।

৩. হামায়েলে গযনভিয়াহ : এটি ঐ গযনভী হামায়েল, যার অনুবাদ শাহ রফীউদ্দীন দেহলভী এবং হাশিয়া মাওলানা আব্দুল আওয়াল গযনভীকৃত। এটি সর্বপ্রথম মাওলানা আব্দুল গফুর বিন মাওলানা মুহাম্মাদ গযনভী অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন এবং তারপর কয়েকবার প্রকাশিত হয়। কতিপয় বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি দারুণ প্রসিদ্ধি অর্জন করে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এখন এটা দুষ্প্রাপ্য।

৪. মুছাফফা মা‘আ মুসাওয়া : এই গ্রন্থ দু’টি শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী রচিত মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেকের দু’টি ভাষ্য। মুসাওয়া  ফার্সীতে এবং মুছাফফা আরবীতে রচিত। এই দু’টি শরাহ একসাথে প্রথমবার মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ গযনভী দিল্লী থেকে প্রকাশ করেন।

৫. কাশফুল মুগাত্তা : এটি নওয়াব ওয়াহীদুয্যামান খানকৃত মুওয়াত্ত্বা মালেকের উর্দূ অনুবাদ। প্রথমবারের মতো এটি মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ গযনভী দিল্লীর মুর্তাযাবী প্রেস থেকে প্রকাশ করেন।

৬. রিয়াযুছ ছালেহীন : সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভীর ইঙ্গিতে এটি প্রথমবারের মতো লাহোর থেকে প্রকাশিত হয় এবং এর উর্দূ অনুবাদ করেন তাঁর শিষ্য মাওলানা আহমাদুদ্দীন কুমাবী। ‘কুম’ লুধিয়ানা যেলার (পূর্ব পাঞ্জাব) একটি গ্রাম। এটি রিয়াযুছ ছালেহীনের প্রথম উর্দূ অনুবাদ।

৭. মাশারিকুল আনওয়ার[6] : এটি ইমাম হাসান বিন মুহাম্মাদ ছাগানী লাহোরীকৃত (মৃঃ ৬৫০ হিঃ) হাদীছের একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। কোন এক সময় এটি পাঠ্যসূচীভুক্ত ছিল। ‘তুহফাতুল আখয়ার’-এর অনুবাদ সহ এটি সর্বপ্রথম গযনভী আলেমগণ প্রকাশ করেন।

৮. ইকাযু হিমামি উলিল আবছার : এই গ্রন্থটি তাক্বলীদের বিরুদ্ধে রচিত। মাওলানা সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভীর ইঙ্গিতে মিয়াঁ আব্দুল আযীয বারএটল’র পিতা মৌলভী ইলাহী বখশ উকিলের (মৃঃ ১৭ই রামাযান ১৩৩৮ হিঃ/৫ই জুন ১৯২০ খ্রিঃ) অর্থায়নে প্রথমবার লাহোর থেকে প্রকাশিত হয়।

৯. তরজমা মিশকাতুল মাছাবীহ : মাওলানা আব্দুল আওয়াল গযনভী মিশকাতের উর্দূ অনুবাদ করেন। এটি কয়েকবার প্রকাশিত হয় এবং খুব গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।

১০. নুছরাতুল বারী : মাওলানা আব্দুল আওয়াল গযনভী ‘নুছরাতুল বারী’ নামে হাশিয়া সহ ছহীহ বুখারীর উর্দূ অনুবাদ শুরু করেছিলেন। মাত্র ৮ পারা সমাপ্ত হয়েছিল।

১১. ইন‘আমুল মুন‘ঈম : মাওলানা আব্দুল আওয়াল গযনভী ‘ইন‘আমুল মুন‘ঈম’ নামে ছহীহ মুসলিমের উর্দূ অনুবাদ শুরু করেছিলেন। এর শুধুমাত্র ১ পারা প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ অনুবাদ হয়েছিল কি-না তা জানা যায়নি।

১২. ইজতিমাউল জুয়ূশ আল-ইসলামিয়্যাহ আলা গাযবিল মু‘আত্তালাত আল-জাহমিয়্যাহ : এটি ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িমের রচনা। প্রথমবার মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী আল-কুরআন ওয়াস সুন্নাহ প্রেস, অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন।

১৩. রিসালাতুল হাকীকাতি ওয়াল মাজায : এটি ইমাম ইবনু তাইমিয়ার ছোট্ট পুস্তিকা। যেটি প্রথমবার মাওলানা আব্দুল গফুর ও মাওলানা আব্দুল আওয়াল গযনভী প্রকাশ করেন।

১৪. জালাউল আফহাম ফিছ-ছালাতি ওয়াস সালাম আলা খায়রিল আনাম : এটি ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম রচিত। মাওলানা আব্দুল কুদ্দূস বিন মাওলানা আব্দুল্লাহ গযনভীর প্রচেষ্টায় মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী প্রথমবার আল-কুরআন ওয়াস সুন্নাহ প্রেস, অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন।

১৫. শারহু হাদীছিন নুযূল : এটি ইমাম ইবনু তাইমিয়া রচিত। মাওলানা আবদুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী আল-কুরআন ওয়াস সুন্নাহ প্রেস, অমৃতসর থেকে এটি প্রথমবার প্রকাশ করেন।

১৬. শারহু খামসীন : ইবনু রজব হাম্বলীর রচনা। মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী প্রথমবার অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন।

১৭. তুহফাতুল ইরাকিয়্যাহ ফিল আ‘মাল আল-ক্বালবিয়্যাহ : ইমাম ইবনু তাইমিয়ার রচনা। মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী প্রথমবার অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন।

১৮. ফাতাওয়া আল-হামাবিয়্যাহ : এটির রচয়িতাও ইমাম ইবনু তাইমিয়া। এটিও প্রথমবার অমৃতসর থেকে মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী প্রকাশ করেন।

১৯. মাজমূ‘আতুল বায়ান আল-মুবদী লিশানাআতিল কাওল আল-মুজদী : আল্লামা সুলায়মান বিন সাহমান নাজদী এর রচয়িতা। এটিও মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী প্রথমবারের মতো অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন।

২০. মাজমূ‘আতুত তাওহীদ আন-নাজদিয়্যাহ ওয়া মাজমূ‘আতুল হাদীছ আন-নাজদিয়্যাহ : এটিও গযনভী আলেমগণ প্রথমবারের মতো দিল্লীর আনছারী প্রেস থেকে প্রকাশ করেন।

২১. ফাতহুল মাজীদ শারহু কিতাবুত তাওহীদ : এই গ্রন্থটি মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভী প্রথমবার প্রকাশ করেন।

২২. ফাতহুল হামীদ শারহু কিতাবুত তাওহীদ : এই গ্রন্থটি মাওলানা আব্দুল গফুর ও আব্দুল আওয়াল গযনভীর ব্যবস্থাপনায় প্রথমবারের মতো আল-কুরআন ওয়াস সুন্নাহ প্রেস, অমৃতসর থেকে প্রকাশিত হয়।

২৩. ইছবাতু উলুবিবর রাবব ওয়া মুবায়ানাতুহু আনিল খালক : এটি মাওলানা আব্দুল জাববার গযনভীর আরবী রচনা।

২৪. ইছবাতুল ইলহাম ওয়াল বায়‘আহ : এটিও মাওলানা আব্দুল জাববার রচিত উর্দূ গ্রন্থ।

২৫. ই‘আনাতুল মিল্লাতিল ইসলামিয়্যাহ : কাফেরদের অধীনে চাকুরী করা নাজায়েয সম্পর্কিত মাওলানা আব্দুল জাববার গযনভী রচিত উর্দূ পুস্তিকা।

২৬. মা‘আরিজুল উছূল বিআন্নাল উছূল ওয়াল ফুরূ বায়নাহার রাসূল : এটি মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ গযনভী রচিত পুস্তিকা।

২৭. দারেমীর হাশিয়া : মাওলানা আব্দুল্লাহ গযনভীর যোগ্য পুত্র মাওলানা আব্দুর রহীম গযনভী হাদীছের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সুনানে দারেমীর আরবী হাশিয়া (পাদটীকা) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। দুঃখের বিষয় হল এটি হারিয়ে গেছে। এর শেষ খন্ডটির পান্ডুলিপি মওজুদ ছিল। এখন কারও নিকট আছে কি-না তা জানা যায়নি।

কুরআন ও হাদীছ সম্পর্কিত এই ২৭টি গ্রন্থ গযনভী পরিবারের আলেমগণ লিখেছেন বা তাঁদের প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়েছে। এটি দ্বীনের অনেক বড় খিদমত, যা নিজেদের যুগে উক্ত আলেমগণ করেছিলেন।

সঊদী সরকারের সাথে সম্পর্ক :

এখানে এটা উল্লেখ করা সম্ভবত সংগত হবে যে, গযনভী পরিবারের আলেমদের সঊদী শাসকদের সাথেও সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কের সূচনা এভাবে হয়েছিল যে, কোন এক সময়ে ব্যবসায়িক কারণে সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভীর দুই পুত্রের (মাওলানা আব্দুর রহীম গযনভী ও মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ গযনভী) আরবের কিছু এলাকায় যাতায়াত ছিল। এই সূত্রে একবার তারা কুয়েত গেলে সেখানে নাজদ ও হিজাযের শাসক সুলতান আব্দুর রহমান ও তাঁর সম্মানিত পুত্র সুলতান আব্দুল আযীয বিন সঊদের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। ঐ সময় এই দুই পিতা-পুত্র কুয়েতে অবস্থান করে নাজদ আক্রমণের প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। গযনভী ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছে পিতা-পুত্র কিছু শিক্ষাও অর্জন করেন। নাজদ বিজয়ের পর তারা সেখানে তাদেরকে দরস-তাদরীসের সিলসিলা শুরু করারও দাওয়াত দেন। এভাবে এই দু’জন ব্যক্তি প্রায় পাঁচ বছর সেখানে অবস্থান করেন এবং সঊদ বংশের কতিপয় ব্যক্তি ও নাজদবাসী তাঁদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন।

এসময় তাঁদের মাধ্যমে ইমাম ইবনু তাইমিয়া ও ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িমের কতিপয় গ্রন্থের পান্ডুলিপিও উপমহাদেশে আসে। যেগুলো গযনভী বংশের আলেমগণ এবং এখানকার কতিপয় প্রকাশক প্রকাশ করে। মাওলানা ইসমাঈল গযনভী ও মাওলানা দাঊদ গযনভী বেঁচে থাকা পর্যন্ত সঊদ বংশের সাথে তাঁদের সম্পর্ক অটুট থাকে। উপমহাদেশের গযনভী বংশের আলেমগণ এই সম্মান অর্জন করেছিলেন যে, বর্তমান সঊদী শাসকদের সাথে সর্বপ্রথম তাদেরই সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। যার ভিত্তি ছিল স্রেফ ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি।

কা‘বার গিলাফ :

গযনভী বংশ সম্পর্কে আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, মহামান্য বাদশাহ আব্দুল আযীয বিন সঊদের হিজায বিজয়ের পর ১৩৪৬ হিজরীতে (১৯২৮ খ্রিঃ) সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভীর দুই পৌত্র মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ দাউদ গযনভী বিন সাইয়িদ আব্দুল জাববার গযনভী ও সাইয়িদ ইসমাঈল গযনভী বিন মাওলানা সাইয়িদ আব্দুল ওয়াহিদ গযনভী অমৃতসরের অত্যন্ত দক্ষ বুননশিল্পীদের দ্বারা কা‘বার গিলাফ তৈরী করান এবং এই দুই নওজোয়ান এই গিলাফ মক্কা মুকাররমায় নিয়ে গিয়ে বাদশাহ আব্দুল আযীযের নিকট পেশ করেন। আর এটি কা‘বা ঘরে লটকানো হয়। এটিই প্রথম (এবং শেষ) কা‘বার গিলাফ ছিল, যেটি অত্যন্ত সংগোপনে উপমহাদেশের গযনভী বংশের দুই তরুণ আলেম মক্কায় নিয়ে যান এবং এর দ্বারা কা‘বা ঘরকে সৌন্দর্যমন্ডিত করা হয়।

মাওলানা ইসমাঈল গযনভী ১৩৭৯ হিজরীর ১৯শে যিলহজ্জ (১৩ই জুন ১৯৬০ খ্রিঃ) মৃত্যুবরণ করেন এবং মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ দাউদ গযনভী ১৮৯৫ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ বা ১৮৯৫ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অমৃতসরে জন্মগ্রহণ করেন (১৩১৩ হিঃ) এবং ১৯৬৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর (২৯শে রজব ১৩৮৩ হিঃ) পরপারে পাড়ি জমান।

মাওলানা গোলাম রসূল মেহেরের কীর্তি :

পূর্বে ইমাম ইবনু তাইমিয়া ও ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িমের রচনাবলী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, গযনভী আলেমদের প্রচেষ্টায় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম সেগুলো প্রকাশের সূচনা হয় এবং ঐ সকল সম্মানিত ইমামদের কতিপয় গ্রন্থের পান্ডুলিপিও আরব দেশ থেকে উক্ত খান্দানের মাধ্যমেই উপমহাদেশে পৌঁছে। এ ব্যাপারে এটাও শুনুন যে, মাওলানা গোলাম রসূল মেহেরই সর্বপ্রথম ইমাম ইবনু তাইমিয়ার জীবনী গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন এবং ১৩৪৩ হিজরীতে (১৯২৫ খ্রিঃ) এই গ্রন্থটি ‘সীরাতে ইমাম ইবনে তাইমিয়া’ শিরোনামে ফারূকগঞ্জ, লাহোরে অবস্থিত আল-হেলাল বুক এজেন্সীর মালিক ও প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আযীয আফেন্দী প্রকাশ করেন। এটি সংক্ষিপ্ত হলেও ইমাম ইবনু তাইমিয়ার প্রথম জীবনীগ্রন্থ। এর পূর্বে (উপমহাদেশে) আরবী বা উর্দূ কোন ভাষাতেই গ্রন্থাকারে ইমাম ছাহেবের জীবনী লিপিবদ্ধ করা হয়নি। অবশ্য  তাঁর সম্পর্কে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ প্রবন্ধ লিখেছিলেন এবং দারুল উলূম নাদওয়াতুল ওলামা, লক্ষ্মৌর পত্রিকা ‘আন-নাদওয়াহ’তেও এ বিষয়ে কতিপয় প্রবন্ধ ছাপানো হয়েছিল।

মাওলানা গোলাম রসূল মেহের ১৩১২ হিজরীর ১৮ই শাওয়াল (১৩ই এপ্রিল ১৮৯৫ খ্রিঃ) জালন্ধর যেলার (পূর্ব পাঞ্জাব) ফুলপুর নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার ও উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সাংবাদিকদের মধ্যে গণ্য করা হত। বিংশ শতকের সাথে সম্পর্কিত উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও ইসলামী আন্দোলনসমূহের তিনি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। বাদশাহ আব্দুল আযীযের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। হিজায বিজয়ের পর তাঁর দাওয়াতেই তিনি মক্কা মু‘আযযামায় গিয়ে হজ্জ করেন এবং বিভিন্ন সময় মহামান্য বাদশাহর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনি ১৯৭১ সালের ১৬ই নভেম্বর (২৭শে রামাযান ১৩৯২ হিঃ) লাহোরে মৃত্যুবরণ করেন।

নওয়াব ওয়াহীদুয্যামানের খিদমত :

নওয়াব ওয়াহীদুয্যামান খান হায়দারাবাদীর পূর্বপুরুষদের মধ্যে এক বুযুর্গ কোন এক সময়ে আফগানিস্তান থেকে হিজরত করে মুলতানে বসতি গেড়েছিলেন। নওয়াব ছাহেবের দাদা মাওলানা মুহাম্মাদ মুলতানে পাঠদানরত অবস্থায় কোন কাজে লক্ষ্ণৌ যান। অতঃপর ওখানকার জ্ঞানপিপাসুদের পীড়াপীড়িতে সেখানে পড়াতে শুরু করেন। তাঁর এক পুত্রের  নাম ছিল মাওলানা মসীহুয্যামান। তিনি কানপুর যাত্রা করে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যে মশগুল হয়ে যান। সেখানে তাঁর গৃহে ১২৬৭ হিজরীতে (১৮৫০ খ্রিঃ) এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। যার নাম রাখেন ওয়াহীদুয্যামান। বড় ভাই হাফেয বদীউয্যামানের কাছে ওয়াহীদুয্যামানের পড়াশোনার হাতে খড়ি হয়। অতঃপর বিভিন্ন শিক্ষকের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন। শায়খ হুসাইন বিন মুহসিন আনছারীর নিকট থেকেও জ্ঞানার্জনের সুযোগ তাঁর ঘটে। হাদীছের দরস গ্রহণের জন্য দিল্লী যাত্রা করে মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভীর ইলমের দরজায় কড়া নাড়েন এবং তাঁর কাছ থেকে হাদীছের সনদ লাভ করে গর্বিত হোন। অতঃপর অনেক জায়গায় যান এবং অসংখ্য আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করেন। পিতার সাথে হজ্জ সম্পাদন করেন। তিনি হায়দারাবাদে (দাক্ষিণাত্য) চাকুরী শুরু করেন এবং দ্রুততার সাথে পদোন্নতি পেতে থাকেন। এক সময় তাঁকে সেখানকার হাইকোর্টের জজ নিযুক্ত করা হয়। কুরআন, হাদীছ, ফিকহ, উছূলে ফিকহ প্রভৃতি বিষয়ে পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। ১৯০০ সালে (১৩১৭ হিঃ) চাকুরী পাওয়ার পর ৩৪ বছর হায়দারাবাদ রাজত্বে চাকুরী করেন। তিনি অধিক অধ্যয়নকারী ও গভীর মনীষার অধিকারী আলেম ছিলেন। মেধা ছিল খুবই তীক্ষ্ণ এবং ধীশক্তি ছিল প্রখর। তিনি কুরআন মাজীদের অনুবাদ করেন, যেটি প্রথমবার মাওলানা আব্দুল গফুর গযনভী ও মাওলানা আব্দুল আওয়াল গযনভী অমৃতসর থেকে প্রকাশ করেন। ইতিপূর্বে যা উল্লেখিত হয়েছে।

উপমহাদেশের ইনিই প্রথম আলেম যিনি মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক, ছহীহ বুখারী, ছহীহ মুসলিম, সুনান আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহর সহজ-সরল ও বোধগম্য উর্দূ অনুবাদ করেন। এই অনুবাদগুলো দারুণ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। নওয়াব ওয়াহীদুয্যামান খান ১৩৩৮ হিজরীর ২৫শে শা‘বান (১৫ই মে ১৯২০ খ্রিঃ) হায়দারাবাদে (দাক্ষিণাত্য) মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর এক বছর পূর্বে তিনি স্বীয় পিতা মসীহুয্যামানকে স্বপ্নে দেখেন। তিনি বলেন, ‘এখন কলস জীবনের পানি থেকে শূন্য হয়ে গেছে’। এর ব্যাখ্যা হল এবার মৃত্যু অত্যাসন্ন।

মাওলানা মুহাম্মাদ আবুল হাসান শিয়ালকোটী :

মাওলানা মুহাম্মাদ আবুল হাসান শিয়ালকোটী ছিলেন পাঞ্জাব প্রদেশের একজন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন আলেম, যিনি মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভীর প্রথম যুগের ছাত্রদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ‘ফায়যুল বারী’ নামে ছহীহ বুখারীর উর্দূ অনুবাদ করেন ও শরাহ লিখেন। এই শরাহটি ছহীহ বুখারীর সাতটি শরাহকে সামনে রেখে লেখা হয়েছিল। শরাহগুলো হল- ফাতহুল বারী, উমদাতুল কারী, ইরশাদুস সারী, কাওয়াকিবুদ দারারী, তায়সীরুল কারী, মিনাহুল বুখারী ও হাশিয়া সিন্ধী। ফায়যুল বারী বড় সাইজের দশটি বৃহৎ খন্ডে হাযার হাযার পৃষ্ঠাব্যাপী। উর্দূতে এ বিষয়ে এটিই প্রথম অনুবাদ ও শরাহ, যা মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভীর ছাত্র এবং শিয়ালকোটের খ্যাতিমান আলেমের আয়াসসাধ্য অতুলনীয় কীর্তি। ১৩১৮ হিজরীতে (১৯০১ খ্রিঃ) এই অনুবাদ ও শরাহ সম্পন্ন হয় এবং লাহোরের পুস্তক ব্যবসায়ী মাওলানা ফকীরুল্লাহ এটি প্রকাশ করেন। মাওলানা ফকীরুল্লাহ স্বীয় যুগের খ্যাতিমান আলেমদের মধ্যে গণ্য হতেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন অনুবাদক, ভাষ্যকার এবং প্রকাশককে জান্নাতুল ফেরদাউসে ঠাঁই দেন।
(ক্রমশঃ)

* পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. মিফতাহু কুনূযিস সুন্নাহ-এর ভূমিকা (লাহোর : সুহাইল একাডেমী, ২য় সংস্করণ, ১৪০৮ হিঃ/১৯৮৭ খ্রিঃ)।

[2]. মাসিক ‘বুরহান’, দিল্লী, আগস্ট ১৯৮৫।

[3]. মাসিক ‘আল-বালাগ’, করাচী, যিলহজ্জ ১৩৮৭ হিঃ।

[4]. মাওলানা আব্দুল্লাহ গযনভী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন : অনুবাদক প্রণীত মনীষী চরিত, মাসিক আত-তাহরীক, মার্চ ২০১৪, পৃঃ ৬৩-৬৬।-অনুবাদক

[5]. সাইয়িদ আব্দুল্লাহ গযনভীর এক ছেলের নামও ছিল আব্দুল্লাহ। সরকার তাকেও পিতার সাথে বন্দী করেছিল।

[6]. ফিকহী বিষয় ভিত্তিক এই হাদীছ গ্রন্থটি ৭ম শতাব্দী হিজরীর মধ্যভাগে দিল্লীতে আসে। মুহাম্মাদ তুগলকের সময়ে (৭২৫-৫২ হিঃ/১৩২৫-৫১ খ্রিঃ) দিল্লীতে এর একটি মাত্র কপি মওজুদ ছিল। সুলতান তার রাজকর্মচারীদের পবিত্র কুরআন ও এই গ্রন্থটি স্পর্শ করে আনুগত্যের শপথ নিতেন। ড. মুহাম্মাদ ইসহাক বলেন, ‘তৎকালীন সময়ে ফিকহের জালে আবদ্ধ হিন্দুস্থান ও মধ্য এশিয়ায় এই কিতাবখানিই মাত্র ইলমে হাদীছের পতাকা উড্ডীন রেখেছিল’ (দ্র. আহলেহাদীছ আন্দোলন (পিএইচ.ডি থিসিস), পৃঃ ২৩১ ও ২২৫)।-অনুবাদক

গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান

গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান


আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন

জনৈক বাদশাহর একজন উযীর ছিল, যিনি সকল বিষয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করতেন। একদিন বাদশাহর একটি আঙ্গুল কেটে তা থেকে রক্ত গড়াতে লাগল। এ অবস্থা দেখে উযীর বললেন, এটা অবশ্যই কল্যাণকর হবে ইনশাআল্লাহ। একথা শুনে বাদশাহ উযীরের উপর রাগান্বিত হয়ে বললেন, আমার আঙ্গুল কেটে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, আর আপনি এর মধ্যে কল্যাণ দেখতে পাচ্ছেন? বিষয়টা বাদশাহকে এত বেশী ক্রোধান্বিত করল যে, তিনি উযীরকে কারান্তরীণ করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু উযীর স্বভাবতই বললেন, এটা অবশ্যই কল্যাণকর হবে ইনশাআল্লাহ।

কিছুদিন পর এক শুক্রবারে অভ্যাসবশত বাদশাহ বেড়াতে বের হয়ে একটি বিশাল জঙ্গলের পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর তিনি জঙ্গলের গহীনে বেড়াতে গিয়ে মূর্তিপূজারী একটি গোত্রের দেখা পেলেন। সেদিন ছিল তাদের পূজার দিন। তারা মূর্তির প্রতি উৎসর্গ করার জন্য কাউকে খুঁজছিল। হঠাৎ তারা বাদশাহকে পেয়ে গেল এবং উৎসর্গ করার জন্য তাকে ধরে নিয়ে গেল। কিন্তু তারা তার একটি আঙ্গুল কর্তিত দেখতে পেয়ে বলল, ‘এ ত্রুটিযুক্ত মানুষ উৎসর্গ করা আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে না’। ফলে তারা তাকে ছেড়ে দিল। ফিরে আসার পথে বাদশাহর উযীরের সেই কথা ‘এটা অবশ্যই কল্যাণকর হবে ইনশাআল্লাহ’ মনে পড়ল। ফলে তিনি রাজ্যে ফিরে এসেই উযীরকে মুক্ত করে দিলেন এবং ঘটনাটি বর্ণনা করে বললেন, সত্যিই আঙ্গুল কেটে যাওয়াটা আমার জন্য কল্যাণকর হয়েছে। তবে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই যে, আমি আপনাকে কারাগারে পাঠানোর সময় আপনি বলছিলেন ‘এটা অবশ্যই কল্যাণকর হবে ইনশাআল্লাহ’। এক্ষণে আপনি কারাগারে গিয়ে কি কল্যাণ লাভ করলেন?

উযীর বললেন, আপনার উযীর হিসাবে সবসময় আমি আপনার সাথে থাকি। আর আমি যদি কারাগারে না যেতাম, তবে অবশ্যই আপনার সাথে জঙ্গলে যেতাম। ইতিমধ্যে তারা আমাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে আমার মধ্যে কোন খুঁত পেত না। তখন তারা আপনাকে বাদ দিয়ে আমাকেই উৎসর্গ করত। এভাবেই কারাগারে গমন করা আমার জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠলো!!
আল্লাহর উপরে ভরসার গুরুত্ব

জনৈক দরিদ্র ব্যক্তি মক্কায় বসবাস করত। তার ঘরে সতী-সাধ্বী স্ত্রী ছিল। একদিন স্ত্রী তাকে বলল, হে সম্মানিত স্বামী! আজ আমাদের ঘরে কোন খাবার নেই। আমরা এখন কি করব? একথা শুনে লোকটি বাজারের দিকে কাজ খুঁজতে বেরিয়ে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সে কোন কাজ পেল না। একসময় ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে সে মসজিদে গমন করল। সেখানে সে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে স্বীয় কষ্ট দূর হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকটে দো‘আ করল। দো‘আ শেষে মসজিদ চত্তরে এসে একটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখল এবং সেটা খুলে এক হাযার দিরহাম পেয়ে গেল। ফলে তা নিয়ে লোকটি আনন্দচিত্তে গৃহে প্রবেশ করল। কিন্তু স্ত্রী উক্ত দিরহাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলল, অবশ্যই আপনাকে এ সম্পদ তার মালিককে ফেরৎ দিয়ে আসতে হবে। ফলে সে পুনরায় মসজিদে ফিরে গিয়ে দেখতে পেল যে, এক ব্যক্তি বলছে ‘কে একটি থলি পেয়েছে যেখানে এক হাযার দিরহাম ছিল?’ একথা শুনে সে এগিয়ে গিয়ে বলল, আমি পেয়েছি। এই নিন আপনার থলিটি। আমি এটা এখানে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। একথা শুনে লোকটি তার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ঠিক আছে ব্যগটি আপনিই নিন। আর সাথে আরো নয় হাযার দিরহাম নিন।

একথা শুনে দরিদ্র লোকটি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তখন লোকটি বলল, সিরিয়ার জনৈক ব্যক্তি আমাকে দশ হাযার দিরহাম দিয়ে বলেছিল যে, এর মধ্য থেকে এক হাযার দিরহাম আপনি মসজিদে ফেলে রাখবেন এবং কেউ তা তুলে নেওয়ার পর আহবান করতে থাকবেন। তখন যে আপনার আহবানে সাড়া দিবে, আপনি তাকে সম্পূর্ণ টাকা প্রদান করবেন। কেননা সেই হ’ল প্রকৃত সৎ ব্যক্তি।

উপদেশ : যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য পথ খুলে দেন এবং এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করেনি’ (তালাক ৬৫/৩)
 স্বীয় কর্মের প্রতিফল

জনৈক বাদশাহ একদিন তার তিন মন্ত্রীকে ডেকে তাদেরকে একটি থলি নিয়ে রাজপ্রাসাদের বাগানে যেতে বললেন। অতঃপর সেখানে গিয়ে তাদের থলিগুলি উত্তম ফল-ফলাদি দ্বারা পূর্ণ করার নির্দেশ দিলেন। এছাড়া তাদেরকে বলে দিলেন, কেউ যেন একাজে একে অপরকে সাহায্য না করে। মন্ত্রীত্রয় বাদশাহর এ নির্দেশে আশ্চর্য হ’ল। কিন্তু কিছু করার নেই। রাজার নির্দেশ। তাই তারা একটি করে থলি নিয়ে বাগানে গেল।

একজন মন্ত্রী বাদশাহকে খুশী করার জন্য সবচেয়ে ভালো ভালো ফল-ফলাদি দ্বারা স্বীয় থলি ভর্তি করল। অপরজন মনে করল বিপুল প্রাচুর্যের অধিকারী বাদশাহর তো আর এত বেশী ফল-ফলাদির প্রয়োজন নেই। তাই সে অবহেলা ও অলসতা বশতঃ ভালো-মন্দ বাছাই না করে হাতের কাছে পাওয়া সবরকমের ফল-ফলাদি দ্বারা থলি ভর্তি করল। আর তৃতীয়জন বিশ্বাসই করল না যে, তাদের থলিতে কি ভরেছে তা বাদশাহ দেখবেন। তাই সে বিভিন্ন লতা-পাতা, খড়-কুটো ও গাছের পাতা দিয়ে ব্যাগ ভর্তি করল।

পরের দিন তারা বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হ’ল। অতঃপর বাদশাহ স্বীয় সৈন্যদেরকে ডাকলেন এবং তিন মন্ত্রীকে তিনমাসের জন্য বন্দী করে রাখতে এবং খাবার হিসাবে উক্ত থলিগুলি তাদের সাথে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এছাড়া আরো নির্দেশ দিলেন যে, তিনমাসের মধ্যে তাদের কাছে কেউ যাবে না এবং তাদেরকে আর কোন খাবারও দেওয়া হবে না।

প্রথমজন উত্তম ফল-ফলাদি খেয়ে আরামেই তিনমাস পার করে দিল। দ্বিতীয়জন তার জমা করা ফলের মধ্যে ভালো গুলি দ্বারা অনেক কষ্টে তিনমাস পার করল। আর তৃতীয়জন একমাস পার হওয়ার পূর্বেই ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করল।

উপদেশ : দুনিয়াবী জীবন উক্ত বাগান সদৃশ। সৎ আমল বা মন্দ আমল উভয়টিই অর্জন করার ব্যাপারে মানুষের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু রাজাধিরাজ আল্লাহ যখন আমাদেরকে কবর নামক বন্দীশালায় বন্দী করবেন, সেখানে কোন আমলটি কাজে আসবে? নিশ্চয়ই সৎ আমল! অতএব ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রত্যেকটি দিনকেই জীবনের শেষ দিন হিসাবে গণ্য করুন। প্রতিদিন কতটুকু সৎ আমল পরকালের জন্য জমা করতে পারছেন তার হিসাব রাখুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন।

আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
নওদাপাড়া, রাজশাহী
- See more at: http://www.at-tahreek.com/july2014/article1101.html#sthash.cql9GTe3.dpuf

Wednesday, July 2, 2014

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক : (7th & Final Part:Online Freelancing Basic)

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক : (7th & Final Part:Online Freelancing Basic)


শেষ পর্ব।বুঝবার সুবিধা হবার জন্য দয়া করে ১ম থেকে ৬ষ্ঠ পর্ব গুলি নিজ দায়িত্তে পড়ে নিন।
এ পর্যন্ত আমরা ইংরেজিতে লেখালেখি সংক্রান্ত যে কয়টি বিষয়ের ফ্রিল্যান্সিং এর গাইডলাইন, নমুনা,ও বিজ্ঞপ্তি দেখেছি সেগুলো হলো: rewriting articles, snippet or short article writing,articles writing or content development, proofreading and editing.

আজকে এই আলোচনার সমাপ্তির পূর্বে আরো কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই। এগুলো হলো translation, transcription, summarization, resume writing, PR writing, PowerPointpresentation, and online teaching বিষয়।

Translation:
ইংরেজি-বাংলা বা বাংলা ইংরেজির অনুবাদের কাজ আমার জানামতে ফ্রিল্যান্সিং সাইটে কম থাকে। বরং প্রফেশনাল সাইট যেমন ট্রান্সলেটরসবেজডটকম, প্রজডটকম ইত্যাদি সাইটে থাকে এবং

এসব সাইটে প্রথমেই পে করে মেম্বারশিপ নিতে হয়। তাই সমস্যা। ব্যক্তিগতভাবে অনুবাদের কাজে আগ্রহ থাকলেও এ সমস্যার জন্য কাজ করা সমস্যা হয়।

Transcription:
এটি খুবই ভালো আয়ের সুযোগ করে দিতে পারে যদি আপনি দক্ষ হতে পারেন। আপনাকে যা করতে হবে তা হলো: আপনি একটি অডিও ফাইল কানে শুনবেন বা একটি ভিডিও দেখবেন এবং সেখানে উচ্চারিত ইংরেজি হুবহু টাইপ করে দিবেন।

অর্থাত আপনার প্রয়োজন মূল দুটি দক্ষতা: ১) ইংরেজি শুনে বোঝা এবং ২) দ্রত টাইপিং দক্ষতা।

এতে রেট কেমন হয়? সাধারণত এক ঘন্টার অডিও বা ভিডিওর জন্য ১০-১৫ ডলার। আপনি যদি কেবল এই কাজের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠেন, তাহলে বেশ কাজের সুযোগ আছে।

Summarization:
সামারাইজেশন কাজটি হচ্ছে একটি আর্টিকেল বা ব্লগ পোস্টকে ১০০-১৫০ শব্দে রূপ দেয়া। কখনো কোন বই এর সংক্ষিপ্ত রূপও চাইতে পারে।

Resume writing:
আমেরিকান কর্পোরেট জগত বা ইন্টারনেট জগতের জন্য উপযুক্ত রেজ্যুমে বা সিভি তৈরী করতে পারলে এ ধরনের কাজও যথেষ্ট পাওয়া যাবে।

PR writing:
বিভিন্ন প্রোডাক্ট বা ওয়েবসাইট এর জন্য প্রেস রিলিজ লেখার কাজ প্রায়দিনই পাওয়া যাবে। এজন্য আপনাকে প্রেস রিলিজ লেখার সঠিক ফর্মাট ও স্টাইল জানতে হবে। এজন্য হয়ত পিআরওয়েবডটকম সাহায্য করতে পারে, আমি যদিও নিশ্চিত না। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে আপনি সঠিক স্টাইলে পিআর তৈরী করতে পারেন।

প্রেস রিলিজ এর পেমেন্ট আর্টিকেল রাইটিং এর চেয়ে বেশী হয়। একটির জন্য ৫-১০ ডলার হয়ে থাকে। কাজও প্রায়ই থাকে।

PowerPoint presentation:
এটি আসলে ইংরেজি ও পাওয়ার পয়েন্ট দক্ষতার সমণ্বয়। আপনাকে কোন বইয়ের চ্যাপ্টার বা মিটিং এর বিষয় বস্তু বা টিউটোরিয়াল সম্বন্ধে প্রেজেন্টশন তৈরী করতে হবে। পেমেন্ট ভাল।মাঝে মাঝেই কাজ থাকে।

Online teaching:
স্কাইপ এর ভিডিও এর মাধ্যমে ইংরেজি শেখানোর সুযোগ আছে। সাধারণত এই কাজ হয় একজনকে শেখানো। ৩০ মিনিট থেকে এক ঘন্টার ক্লাস।

এ পর্যন্ত তাহলে সংক্ষিপ্ত দিকনির্দেশনা দেয়া হলো এসব বিষয়ে: rewriting articles, snippet or short article writing, articles writing or content development, proofreading,editing এবং translation, transcription, summarization, resume writing, PR writing, PowerPoint presentation, and online teaching বিষয়ে।

এখানেই শেষ হলো বিষয়ভিত্তিক আলোচনা।
=============================================

এখন কয়েকটি সামগ্রিক টিপস দেখা যেতে পারে:
প্রথম টিপস:
আপনি যদি আসলেই এমন কাজ করে উপার্জন করতে চান, তবে তা সম্ভব। অবশ্যই দরকার হবে:
১) পরিশ্রম,
২) সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা,
৩) লেগে থাকার ধৈর্য এবং
৪) আপনার নিজস্বতা।

একটি কথা মনে রাখবেন ফিলিপিনোরা আর ভারতীয়রা আমাদের চেয়েও কম পারিশ্রমিকে এমপ্লয়ারকে সন্তুষ্ট করতে সদাপ্রচেষ্ট। তবে সঠিক দক্ষতা ও প্রফেশনালিজম এর সমণ্বয় ঘটালে কম

পারিশ্রমিকের কাজ এড়াতে পারবেন।

দ্বিতীয় টিপস:
আপনি যদি আপনার ফ্রিল্যান্সার প্রোফাইলে আপনার কাজের জন্য ঘন্টাপ্রতি খুবই কম রেট দেখান, তবে তা যেমন একটি সুবিধা দিতে পারে, তারচেয়ে বেশী অসুবিধা করতে পারে।

কম রেট দেখ অনেক এমপ্লয়ার হয়ত আপনাকে কাজ দিতে পারে কিন্তু এর ফলে আপনি বেশী রেটের কাজে এপ্লাই করলে কাজ সহজে পাবেন না। তাই প্রথমেই ঠিক করতে হবে আপনি

কোন মানের কাজ করতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী রেট ঠিক করতে হবে। রিরাইটিং এর জন্য ঘন্টায় ৪-৬ ডলার দেখানো যেতে পারে। কিন্তু প্রুফরিডিং এর জন্য এর উর্ধ্ব হতে হবে

অবশ্যই। আমি এ বিষয়ে একেবারে এক্সপার্ট নয়। আপনি সাইটগুলোর ফোরামে ঢুকে দেখেন এ বিষয়ে কেমন মন্তব্য আছে।

তৃতীয় টিপস:
যে সাইটেই পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ আছে সেখানে পরীক্ষাগুলো দিয়ে ভাল ফল করলে কাজ পাবার সুযোগ বাড়ে। আপনার আইএলট্স স্কোর ভাল থাকলে উল্লেখ করবেন অবশ্যই।

চতৃর্থ টিপস:
ফ্রিল্যান্সিং সাইটে ঢুকে কাজ শুরুর আগে কিছুদিন অবশ্যই অন্যান্য ফ্রিলান্সারদের প্রোফাইল দেখে কিছু অভিজ্ঞতা নিতে হবে। এটি আমার মেন হয় অনৈতিক হবে না। যারা তাদের প্রোফাইল

দেখাতে চান না তারা গোপন কের রাখবেন।

পঞ্চম টিপস:
ফ্রিল্যান্সিং সাইটের ব্লগ বা ফ্রিল্যান্সার ফোরামে ঢুকে লেখা পড়ুন। আলোচনা পড়ুন। অনেক দিকনির্দেশনা পাবেন।

ষষ্ঠ টিপস:
হুট করে কোন কাজে বিড করবেন না। কাজটি সঠিক সময়ে করে দিত পারবেন কিনা সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমপ্লায়ারের ইতিহাসও দেখবেন যে তার ফিডব্যাক ভালো কিনা।

সপ্তম টিপস:
কয়েকজন ফ্রিলান্সার এর পাবলিক প্রোফাইল দেখতে পারেন। কয়েকটি লিংক দেয়া হলো যেগুলো সবার জন্য উম্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং ওসব সাইটের মেম্বার না হলেও দেখা যায়। এটি নৈতিকতার সীমার মাঝে বলে মনে করছি:

ইংরেজি ও ডাটা এন্ট্রিতে পারদর্শী বাংলাদেশী (যতসম্ভব বছরে ১০ হাজার ডলার আয় করেন):http://www.odesk.com/users/~~84f8acb246b6e3cb

মিশরীয় ফ্রিল্যান্সার ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রিধারী ঘন্টায় ২৫ ডলার রেটে কাজ করেন:
http://www.odesk.com/users/~~1ad9a9c5e7e2a12f

বাংলাদেশী যিনি অন্তত ১৬০টি লেখালেখির প্রজেক্ট করেছেন ও করিয়েছেন:
http://www.freelancer.com/users/645693.html

ঘন্টাপ্রতি প্রায় ২ ডলার রেটে ২০০০ এর বেশী ঘন্টা কাজ করা বাংলাদেশী:
http://www.odesk.com/users/~~d962be5047773601

বাংলাদেশী যিনি অন্তত ২৬০টি লেখালেখির প্রজেক্ট করেছেন:
http://www.freelancer.com/users/756615.html

পাকিস্তানি আর্টকেল রাইটার (ঘন্টা প্রতি ৫-৬ ডলার রেটে কাজ করেন):
http://www.odesk.com/users/~~f8f9db4c7ef80498

অষ্টম টিপস (খুব খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ):
কিভাবে ওডেস্ক বা ফ্রিল্যান্সার থেকে ডলার দেশে আনবেন তার জন্য সবচে ভাল দিকনির্দেশনা দেয়া আছে জনাব জাকারিয়া চৌধুরীর সাইটে। এই একটি পৃষ্ঠার বিভিন্ন লিংকে ঢুকে সব

প্রশ্নাত্তরগুলো পড়লে যা জানবেন তা হয়ত কোথাও পাওয়া যাবে না। আমার মতে সব সমাধান পাবেন। এর বাইরে আমার কিছু জানা নেই, উত্তরও নেই। সেই পৃষ্ঠার লিংকটি নীচে দেয়া হলো:
Click This Link

এছাড়া জনাব জাকারিয়া চৌধুরীর সাইটটির মূল লিংকটি হলো: http://www.freelancefest.com

এছাড়া আপনি ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে সাফল্য ও আরো অন্যান্য উপায় জানার জন্য আরো দেখতে পারেন চমতকার এই বাংলা সাইটটি: http://www.freelancerstory.blogspot.com

এই দুটি সাইটের বাইরে জনাব জিন্নাত উল হাসান এর বাংলা ব্লগে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে আরো কিছু তথ্য পেতে পারেন: http://www.bn.jinnatulhasan.com
============================================

শেষ কথাটি খেয়াল রাখুন:

আমি প্রথম দিনই বলেছিলাম যে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই সাত পর্বের গাইডলাইন এর বাইরে সাহায্য বা পরামর্শ দেয়ার মত অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা কোনটাই ধারণ করি না।
এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে আমি MBAপড়াশোনা আর জব নিয়ে busy থাকি, শখের বশে কিছুটা হাতড়ে বেরিয়েছি, তাই এসব ব্যাপারে আরো পরামর্শ দিতে যদি অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সাহায্য করেন তাহলে বেশ হয়।

এই পর্বে যদি কেউ কোন প্রশ্ন রাখেন, তার উত্তর যে আদৌ আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব হবে তা হয়ত সম্ভব নাও হতে পারে। প্রতিদিন ইন্টারনেটে বসাও হয় না। তথ্য উপস্থাপনে দেরীও হতে পারে। এমন হলে সেটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

ভাল থাকুন। সফল হোন। ধন্যবাদ।

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক :প্রথম পর্ব (Online Freelancing Basic - 1st part)

২য় পর্ব: অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক : (2nd part: Online Freelancing Basic )

৩য় পর্ব: অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক : (3rd part: Online Freelancing Basic)

৪র্থ পর্ব: অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক : (4th part: Online Freelancing Basic)

৫ম পর্ব: অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক : (5th part: Online Freelancing Basic)

৬ষ্ঠ পর্ব: অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বেসিক : ( 6th-Part: Online Freelancing Basic)

 Related post:

ফ্রিল্যান্সিং শিখুন অনলাইনে সম্পূর্ণ ফ্রী।
 সারাদেশে অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং কোর্স প্রশিক্ষণ
ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারঃ সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (প্রাইম আইটি লিঃ)
ফ্রিল্যান্সারদের যে ৭ বিষয়ে দক্ষতা প্রয়োজন


 

মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট আবেদন করুন অনলাইন থেকে

মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট আবেদন করুন অনলাইন থেকে


আর নয় দালালদের হাতে পায়ে ধরা, আর নয় পাসপোর্ট করা নিয়ে হেনস্তা, কারণ Machine Readable Passport এর আবেদন এখন ঘরে বসে অনলাইনেই সারতে পারবেন !

মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) কি?
হাতে লেখা পাসপোর্ট-এর বদলে বাংলাদেশে সম্প্রতি চালু হয়েছে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)। দেশের বাইরে যেতে বা প্রবাসীদের দেশে ফেরার সময় এয়ারপোর্টের ভোগান্তি

এড়াতেই চালু করা হয়েছে এই পাসপোর্ট। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নীতিমালা অনুযায়ী এবছরের এপ্রিল মাস থেকে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট- সংক্ষেপে

(এমআরপি) ও ভিসা চালুর বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। প্রচলিত পাসপোর্টের মতোই দেখতে নতুন এই এমআরপি। কেবল পার্থক্য হলো এই পাসপোর্টে থাকা তথ্য এয়ারপোর্টে থাকা কম্পিউটার

পড়তে পারে । তবে, এপ্রিলে চালু করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও যারা আগের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন, তাঁদের পুরোনো পাসপোর্টেই চলবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত।

কোথায় আবেদন করবেন?
এখন হতে MRP পাসপোর্টের জন্য আবেদন অনলাইনে করা যাবে। আর দালালের হাতে পায়ে ধরতে হবে না। শুধু অনলাইনে আবেদন করুন আর পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে হাতের ছাপ দিয়ে

আসুন। দেশে ও দেশের বাইরে ইন্টারনেট থেকে এই আবেদন করা যাবে।
অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদনের ঠিকানাঃ

http://www.passport.gov.bd/



আগে যেভাবে পাওয়া যেত মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট
হাতে লেখা পাসপোর্টের আবেদন ফরমের চেয়ে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্টের আবেদন ফরম কিছুটা ভিন্ন। আগের মতোই ইন্টারনেট থেকে বিনামূল্যে ফরম সংগ্রহ করা যাবে। বহিরাগমন ও

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেই (www.dip.gov.bd) এই ফরম পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ঢাকাসহ সারা দেশে ১০টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকেও সংগ্রহ করা যাবে এই ফরম এবং

বিনামূল্যেই। তবে, ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত এমআরপির আবেদন ফরমটি নামিয়ে প্রিন্ট করে তাতে হাতে লিখতে হয়। কম্পিউটারে টাইপ করে ফরম পূরণ করার সুযোগ নেই।

কী আছে নতুন আবেদনপত্রে
চার পৃষ্ঠার এ আবেদনপত্রে আবেদনকারীকে নাম, বাবার নাম, মার নাম, তাদের পেশা, জাতীয়তা, জন্মস্থান, জন্ম তারিখ, জন্ম সনদপত্র নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, বর্তমান ও স্থায়ী

ঠিকানা, যোগাযোগের তথ্য সরবরাহ করতে হবে। এসব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করে আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট জায়গায় স্বাক্ষর ও তারিখ লিখতে হবে। এ ছাড়া আবেদনকারীকে একটি ৫৫

/৪৫ মিলিমিটার আকারের রঙিন ছবি (পাসপোর্ট সাইজ ছবি) ফরমে আঠা দিয়ে লাগানোর পর সত্যায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে, দুটি আবেদন ফরম পূরণ করে জমা দিতে হবে।

কারা সত্যায়িত করতে পারেন
আবেদন ফরমের সত্যায়ন করতে পারবেন- ১. সাংসদ ২. সিটি করপোরেশনের মেয়র, ডেপুটি মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর ৩. গেজেটেড কর্মকর্তা ৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ৫. উপজেলা

পরিষদ ও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ৬. পৌরসভার মেয়র ৭. বেসরকারি কলেজের শিক্ষক ৮. বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ৯. দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ১০. পৌর কাউন্সিলর

১১. রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সপ্তম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা।

খরচ
এমআরপির জন্য নতুন ফি নির্ধারিত হয়েছে। সাধারণ পাসপোর্টের জন্য তিন হাজার টাকা এবং জরুরি পাসপোর্টের জন্য ছয় হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হবে। টাকা জমা দিতে হবে

আগের মতোই সোনালী ব্যাংকের নির্ধারিত শাখায়।

কাগজপত্র যা লাগবে
সঠিকভাবে পূরণ করা আবেদন ফরমের সঙ্গে প্রার্থীকে আবেদনকারীর একটি রঙিন ছবি আঠা দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে লাগিয়ে দিতে হবে, সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম সনদপত্রের

ফটোকপি। অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৫ বছরের কম) আবেদনকারীর ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বাবা ও মায়ের একটি করে রঙিন ছবিও লাগবে।

আবেদনপত্র জমা দেওয়ার আগে
আবেদন পত্র জমা দেওয়ার আগেই তা নির্দিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা এটি ভেরিফিকেশন বা যাচাই করবেন। আবেদপত্রটি ভেরিফিকেশন করানোর আগে এর সঙ্গে ব্যাংককে

টাকা জমা দেওয়ার রশিদটি আঠা দিয়ে আবেদন পত্রের সঙ্গে যোগ করে দিতে হবে। এ ছাড়া আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত ছবিটিও যথাযথ কর্মকর্তাকে দিয়ে সত্যায়িত করে নিতে হবে।

পাশাপাশি জাতীয় পরিচয় পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদের ফটোকপিটিও সত্যায়িত হতে হবে। যদি কারও জাতীয় পরিচয় পত্র না থাকে তাহলে পাসপোর্ট ফরমের তৃতীয় পৃষ্ঠায় নির্দিষ্ট স্থানে

বসবাসরত এলাকার জনপ্রতিধি দ্বারা প্রত্যয়ন করিয়ে নিতে হবে। এমআরপির আবেদন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়া যাচ্ছে দেশের ১০টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে। প্রতিটি আঞ্চলিক

অফিসের অধীনে রয়েছে কয়েকটি জেলা। আঞ্চলিক অফিসগুলো হলো- ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর, যশোর ও গোপালগঞ্জ।
আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসগুলোর মধ্যে রয়েছে-

ঢাকা
ঢাকা, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা।

ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ জেলা।

চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলা।

কুমিল্লা
কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা।

সিলেট
সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা।

রাজশাহী
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা।

বরিশাল
বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলা।

রংপুর
রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলা।

যশোর
যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা।

জমা দেবার নিয়মকানুন
আবেদন পত্রটির ভেরিফিকেশন করে দায়িত্বরত কর্মকর্তা আবেদনপত্র যাচাই করে সিলসহ স্বাক্ষর করবেন। এরপর আবেদনপত্রটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা দিতে হবে। পাসপোর্ট অফিসেই খোলা আছে

বেশ কয়েকটি বুথ। এসব বুথেই জমা দিতে হবে।

আবেদনপত্রটি জমা দেবার সময় পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বরত ব্যাক্তি আপনার তথ্যগুলো কম্পিউটারে এন্ট্রি করে রাখবেন। এরপর তিনি আপনাকে একটি টোকেন দেবেন। এরপর সে

টোকেনসহ আবেদনপত্রটি নিয়ে ছবি তোলার জন্য আরেকজন কর্মকর্তার কাছে যেতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য যেভাবে ছবি তোলা হয়েছিলো, এখানেও একইভাবে নির্দিষ্ট মাপের ছবি

তোলা হবে। এছাড়াও দুই হাতের আঙ্গুলের ছাপও দিতে হবে ইলেকট্রনিক মেশিনে । এরপর নেয়া হবে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর। তবে, ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর আবেদন পত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে যেনো

মিল থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এই প্রক্রিয়া শেষে কর্তৃপক্ষ পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য একটি আলাদা ডকুমেন্ট দেবে এবং আবেদনপত্রটি রেখে দিয়ে আপনাকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করার

তারিখও জানিয়ে দেবেন।

পাসপোর্ট সংগ্রহ
কর্তৃপক্ষের দেয়া তারিখে পাসপোর্ট সংগ্রহ করা যাবে। তবে, এই সময়ের মধ্যে অবশ্যই পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ হতে হবে। পাসপোর্ট দেবার আগে ডিবি পুলিশ বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানায়

ভেরিফিকেশন করে। আর পুলিশের রিপোর্ট প্রদানের পরই পাসপোর্ট পাওয়া যায়।

নতুন পাসপোর্ট যেমন
জানা গেছে, নতুন যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট বিভিন্ন দেশের উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাসপোর্টের আদলে তৈরি। এ পাসপোর্টে উন্নত দেশগুলোর পাসপোটের মতোই বিশেষ কাপড়ের কভার ব্যবহার

করা হয়েছে। হাতে লেখা পাসপোটের মতোই শুরু থেকে ৫ থেকে পঞ্চম পৃষ্ঠা পর্যন্ত ছবিসহ প্রয়োজনীয় এক পাতায় আছে। আছে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরও। পুরোনো পাসপোর্টে বিভিন্ন

দেশের ভিসা লাগানো থাকলে সেগুলো এই পাসপোর্টে থাকছে না।

এ পাসপোর্টে এক পাতার এসব তথ্যের পাশাপাশি একপাশে আছে বিশেষ সাংকেতিক নম্বর, যাকে ‘যন্ত্রে পাঠযোগ্য এলাকা’ বলা হয়। এই নম্বরের মধ্যেই থাকছে পাসপোর্টধারীর সব তথ্য, যা

কম্পিউটার পড়তে পারে। জানা গেছে, পুরো প্রক্রিয়াটিই চলছে আন্তর্জাতিক মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের অনুমোদন সংস্থা আইসিএভি-এর নির্দেশনা অনুসারে।

এমআরপির তথ্যগুলো যখনই কম্পিউটার এই নম্বরের মধ্যে পড়ে, তখনই মনিটরে সেসব তথ্য দেখা যায়। এই পৃষ্ঠায় রয়েছে জাতীয় পশু বাঘ ও জাতীয় ফুল শাপলার জলছাপ। আরও

আছে নানা ধরনের নিরাপত্তা দাগ। পাতার বিভিন্ন স্থানে বাঘের ছবির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের নাম ও শহীদ মিনারের ছবি। এসব জলছাপ বিশেষ আলো দিয়ে দেখলে লেজার রশ্মির

মতো দেখায়। এমআরপির শেষ পাতায় আছে সংসদ ভবনের ছবি ও পরিচিতি।

Tuesday, July 1, 2014

ঐশী আতিথ্যের মাস-রমজান : ২০১৩ (২য় পর্ব)

 ঐশী আতিথ্যের মাস-রমজান : ২০১৩ (২য় পর্ব)


রমযান মাস হলো আল্লাহর রহমত ও দয়ার হিমেল বায়ুপ্রবাহের মাস। মানুষের মন এবং আত্মার ওপর দিয়ে বিশেষ করে যাঁরা আল্লাহর রহমতের কাঙ্গাল তাদেঁর দেহ-মন-আত্মার উপর দিয়েই রহমতের এ বায়ু প্রবাহিত হয়। এখন মানুষ কতোটা ধারণ করবে বা করতে চেষ্টা চালানো উচিত তা নির্ভর করছে বরকতপূর্ণ এই মাসের মর্যাদা কে কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছে-তার ওপর। আল্লাহ আমাদেরকে এই মহান মাসটির মর্যাদা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার তৌফিক দিন-এই কামনায় শুরু করছি রহমতের অতিথির আজকের আয়োজন।


রাসুলে খোদার একটি হাদিস দিয়ে শুরু করবো আজকের আলোচনা। রাসূল ( সা ) বলেছেন,"তুমি যদি চাও তোমার বুকের ভেতরের অশান্তি কমে যাক তাহলে রমযানের রোযা এবং প্রতিমাসে তিনটি করে রোযা রাখো।"হযরত আলী ( আ ) ও বলেছেন,"প্রতিমাসে তিনটি রোযা এবং রমযান মাসের রোযা বুকের ভেতরকার জটিলতা এবং পেরেশানীগুলো দূর করে দেয়।" প্রতিমাসের রোযার দিনগুলোরও উল্লেখ করেছেন তিনি। দিনগুলো হলো মাসের প্রথম এবং শেষ বৃহস্পতিবার এবং মাসের মধ্যবর্তী বুধবার। দেহ এবং আত্মার ওপরে এই যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে-এটাও রোযার অন্যতম একটা ফযীলত,বড়ো ধরনের বৈশিষ্ট্য।

 আসলে রমযানের এই বাহ্যিক উপকারিতার কথা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে। এ বিষয়টি এখন সর্বজনগ্রাহ্য একটি বাস্তবতা। আল্লাহ যেহেতু আমাদের জন্যে এই বিধানটি দিয়েছেন,ফলে এতে যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত থাকবে-তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। কী কী বাহ্যিক কল্যাণ রয়েছে রোযার মধ্যে-সেসব আবিষ্কারের বিষয়। আবিষ্কৃত হলে ভালো,আর আবিষ্কৃত না হলে বিশ্বাসে কোনোরকম কমতি হওয়াটা দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক। আমরা তাই সেদিকে না গিয়ে রোযার আধ্যাত্মিকতার দিকেই অগ্রসর হবার চেষ্টা করবো।

রমযান মাসে আল্লাহর রহমতের দ্বার অবারিত হয়ে যায়। রহমত মানে আল্লাহর অনুগ্রহ। অনুগ্রহ ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এর তাৎপর্য ব্যাপক। আল্লাহ আমাদের যতো কাজের যোগ্যতা দিয়েছেন,শারীরিক সুস্থতা দিয়েছেন,ভাববার মতো চেতনা দিয়েছেন,উদ্ভাবন করার শক্তি দিয়েছেন,কথা বলা,কাজ করা,চিন্তা-ভাবনা করার সামর্থ দিয়েছেন,মেধা দিয়েছেন মনন দিয়েছেন,আত্মা দিয়েছেন,সেগুলোকে ব্যবহার করে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদায় উন্নীত হবার সুযোগ দিয়েছেন-এ সবই আল্লাহর অনুগ্রহ। আবার অনুগ্রহ মানে ক্ষমা। এগারো মাসব্যাপী যতোরকম অন্যায়-অমূলক-অসঙ্গত আর অসমীচীন কাজ করে আল্লাহর দরবারে আসামী হয়েছি,সেই আসামীকে আল্লাহ যে মাফ করে দেবেন বলে কথা দিয়েছেন-এটা তো বিশাল এক অনুগ্রহ। আর সেই মাফ করে দেওয়ার ঘটনাটি ঘটবে এই রমযান মাসে।

এ জন্যেই রোযাকে বলা হয়েছে জুন্নাহ বা ঢালস্বরূপ। কারণ রোযার মাধ্যমে আল্লাহর বান্দারা দোযখের আগুন থেকে রক্ষা পায়,মুক্তিও পায়। রাসূলে খোদা বলেছেন এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দান করেন। তাহলে রোযা যেমন জাহান্নামে যাবার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে,তেমনি জাহান্নামে যাবার পরও সেখান থেকে মুক্তি লাভ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। আল্লাহর এতো বড়ো রহমতের বিষয়টিকে যে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে-তারচেয়ে হতভাগ্য আর কে থাকতে পারে!আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে রমযানের তাৎপর্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন।

একটি হাদীসে এসেছে,রাসূল ( সা ) বলেছেন-রোযা এবং কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্যে সুপারিশ করবে। রোযা বলবে-হে রব!আমি তাকে পানাহার ও কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তুমি তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করো।এটা যে কতো বিশাল প্রাপ্তি-তা কল্পনাই করা যায় না। কেননা আপনারা জানেন যে,কিয়ামতের দিন গুনাহগার বান্দারা আল্লাহর দরবারে তার জন্যে সুপারিশ করার লক্ষ্যে নবীরাসূলদের শরণাপন্ন হবে। কিন্তু তাদেঁর অনেকেই বিনয়বশত কিংবা আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে তুচ্ছ বলে প্রমাণ করার জন্যে কারো পক্ষে সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন। কঠিন সেই মুহূর্তে রোযা এবং কোরআন যদি সুপারিশ করার জন্যে এগিয়ে আসে-সেটা যে কতো বড়ো প্রাপ্তি হবে তা একবার কল্পনা করে দেখুন তো। কিন্তু রোযা এবং কোরআন কখন আপনার জন্যে সুপারিশ করবে? যখন আপনি তাদের সুপারিশ পাবার যোগ্যতা অর্জন করবেন,তখন।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে,রমযান মাস আসলেই কেবল কোরআনের মাহাত্ম্য বা মর্যাদা নিয়ে আমরা কথা বলি,কিংবা কোরআন পাঠ বা চর্চা করি। বাকি মাসগুলোতে কোরআনকে ভুলে যাই।আর রমযান আসলে আমরা নিজেদেরকে সংযত রাখার চেষ্টা করি,রমযান চলে গেলেই আমরা পুনরায় উদ্ধত হয়ে পড়ি।ফলে এগারো মাস কাউকে ভুলে থেকে একটিমাত্র মাসে তার সেবা খেদমত করলে সে যে কতোটা তুষ্ট হবে-তা কিন্তু ভেবে দেখার বিষয়। তবুও চেষ্টা করতে হবে রমযানের মাসটিকে সবোর্চ্চ গুরুত্ব দিয়ে সর্বাধিক অর্জন করার এবং রমযানের সময়কার ইবাদাত চর্চাকে অন্যান্য মাসেও অব্যাহত রাখার। তবে রমযান মাসকে যেহেতু আল্লাহ নিজের বলে ঘোষণা দিয়েছেন,সেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এ মাসকে যথার্থভাবে কাজ লাগাতে হবে। আল্লাহ যেহেতু রাহমান এবং রাহীম,সেহেতু তিনি সন্তুষ্ট হলে তাঁর রহমতের বারি দিয়ে জাহান্নামের আগুনকে আপনার জন্যে নিভিয়ে দিলেও দিতে পারেন। এই সুযোগটাও কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট একটা রহমত।

আমাদের মাঝে নববর্ষ সংস্কৃতির একটা প্রচলন আছে। সাধারণত মনে করা হয় যে বছরের শুরুটা যেভাবে আনন্দ-আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়,বাকি মাসগুলোতে তার প্রভাব পড়ে। এটা একান্তই লোকবিশ্বাস। এর সাথে দ্বীন বা বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই বিশ্বাসটাকে ইতিবাচক অর্থে ধরে নিয়ে বলা যায় ইবাদাতের জন্যে,আত্মশুদ্ধির জন্যে,পরকালীন মুক্তির জন্যে রমযান হলো আধ্যাত্মিকতা চর্চার নববর্ষ। তাই রমযান মাসটিকে আমরা যেভাবে ইবাদাত-বন্দেগীর মধ্য দিয়ে কাটাই,সেভাবে রমযানকে ইবাদাত বর্ষের সূচনা বলে ধরে নিয়ে যেন বাকি মাসগুলোতে রমযানের কর্মসূচিগুলোকে অব্যাহত রাখার চেষ্টা করি।

 পবিত্র কোরআনে আল্লাহহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন নিঃসন্দেহে মুমিনরা পরস্পরে ভাই-ভাই। সুতরাং তোমাদের ভাইদের মধ্যে তোমরা শান্তিস্থাপন করবে। আর তোমরা পরহেজগার হবে অর্থাৎ আল্লাহকে ভয়-ভক্তি করবে,যাতে আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর রহমত বা অনুগ্রহ বর্ষণ করেন। প্রকৃতপক্ষে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এই পরিবেশটা কেবলমাত্র রমযান মাসেই কিছুটা অনুভব করা যায়। বলাবাহুল্য,পৃথিবী জুড়ে বর্তমানে যতো অরাজকতা আর জুলুম-নির্যাতন দেখা যাচ্ছে,তার মূলে রয়েছে মানুষের সাথে মানুষের ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্কের অভাব। তাই রমযান মাসের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশটাকে যদি সারা বছর ধরে বজায় রাখা যায়,তাহলে পৃথিবীটা হয়ে উঠবে ইহজাগতিক বেহেশত। রমযান এদিকে থেকেও আল্লাহর বান্দাদের জন্যে তাঁর এক অসাধারণ রহমত বা অনুগ্রহ। #

ঐশী আতিথ্যের মাস-রমজান : ২০১৩ (১ম পর্ব) ফামান শাহিদা

ঐশী আতিথ্যের মাস-রমজান : ২০১৩ (১ম পর্ব)

ফামান শাহিদা

 মিনকুমুশ্‌ শাহরা ফাল্‌ইয়াসুমহু
" কাজেই তোমাদের মাঝে যে মাসটি পাবে, সে যেন রোযা রাখে।"

সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত এটি। এই একটি মাত্র আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সাওম বা রোযা সবার জন্যেই অবশ্য পালনীয় একটি ইসলামী বিধান। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি বিধানের একটি হলো রোযা। তবে এই বিধানটি কেবল আমাদের জন্যেই নয় বরং আমাদের পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণের উম্মাতদের জন্যেও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল। যেমনটি কোরআনেই বলা হয়েছে, ‘কামা কুতিবা আলাল লাজিনা মিন ক্বাবলিকুম' অর্থাৎ 'যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও সিয়ামকে ফরয করা হয়েছিল।'

 অশোধিত তেলকে যেমন পরিশোধন করেই জ্বালাতে হয়, ব্যবহার করতে হয়, তেমনি মানুষের মন ও আত্মাকেও যথার্থভাবে কাজে লাগানো বা ব্যবহার করার জন্যে বছরে একবার তাকে পরিশোধন করে নিতে হয়। নইলে অশোধিত তেলের মতো ময়লাযুক্ত আত্মা কিংবা মনে খোদায়ী নূর জ্বলবে না। পবিত্র রমযান মাস হলো অন্তরাত্মাকে পরিশোধন করার শ্রেষ্ঠ সময়। ব্যক্তিগত বিচিত্র ভুলের কারণে শয়তানীর যতো আচ্ছাদন পড়েছে মানুষের অন্তরের আয়নায়, যতো মরিচা ধরেছে তাতে অন্যায় আচরণ আর অনৈতিকতার চর্চার কারণে, সেগুলোকে ধুয়ে মুছে পূত-পবিত্র করে মনের ঘরে আধ্যাত্মিকতার প্রদীপ জ্বালানোর সর্বোত্তম সময় রমযান। পবিত্র কোরআনের সূরা যুমারে আল্লাহ বলে দিয়েছেন, ‘ইন্নামা ইউয়াফফাস সাবিরুনা আজরাহুম বিগাইরি হিসাব' অর্থাৎ যারা প্রবৃত্তির রিপুগুলোকে দমন করে সঠিক পথে অটল থাকবে, তাদেরকে অগণিত সওয়াব প্রদান করা হবে। আর রমযান মাসটিই হলো তার অনুশীলনের শ্রেষ্ঠ ও যথার্থ সময়।

 এই মাসটি যেন রোযাদারের জন্যে মেহমানীর মাস। রোযাদার হলেন আল্লাহর মেহমান আর মেহমানের সামনে যে দস্তরখান আল্লাহ বিছিয়ে দিয়েছেন তাতে রয়েছে রহমত, তাতে রয়েছে বরকত এবং তাতে রয়েছে মাগফেরাতের বিচিত্র ভোজের রেসিপি। এখন যারা এইসব ঐশী ভোজে নিজেকে তৃপ্ত-পরিতৃপ্ত করতে চান তারা কোনোরকম কার্পণ্য না করে, কোনোরকম অবহেলা কিংবা কালক্ষেপন না করে নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন-এটাই স্বাভাবিক। ইবাদাত আর আধ্যাত্মিকতার সুগন্ধি দিয়ে নিজেদের অন্তরাত্মাকে মৌ মৌ করে তুলবেন-সেই সুবর্ণ সময় এসেছে আজ। মৌলাভি যেমনটি বলেছেন,

 সত্যের সুগন্ধি শীতল সমীর
এ সময় নিয়ে আসে ঐশী পাঠ
অপূর্ব এ উপহার থেকে সন্তর্পনে
যতো পারো করে যাও লুটপাট।

রহমতের সমীরণ এসে আবার চলে যায়
যাকে ইচ্ছে তাকে সে প্রাণবায়ু দিয়ে যায়

আবার এসেছে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
প্রস্তুতি নাও হে গোলাম, করো অবগাহন।


হিজরী পঞ্জিকার বারোটি মাসের মধ্যে একটি মাসের নাম হলো রমযান। অথচ মজার ব্যাপার হলো পবিত্র কোরআনে কেবলমাত্র এই রমযান মাসেরই নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই বিশ্লেষকমহল মনে করছেন যে, আল্লাহর কাছে এ মাসটির অসামান্য মর্যাদা রয়েছে। যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই বলেছেন, ‘আস সাওমু লি, অ-আনা আজযি বিহী' অর্থাৎ ‘রোযা আমার জন্যে রাখা হয এবং আমিই তার প্রতিদান দেবো।' পরকালে যে তিনি কী পুরস্কার দেবেন তার কিছুটা ইঙ্গিত নবী কারিম (সাঃ) আমাদের দিয়েছেন। সে থেকে রোযাদারগণ নিশ্চয়ই পরিতৃপ্ত হবার আনন্দ পাবেন। রাসূলে খোদা বলেছেন, ‘রমযান এমন একটি মাস যে মাসে আল্লাহ তোমাদের জন্যে রোযা রাখাকে ফরজ করে দিয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোযা রাখবে, তার জন্যে রোযার সেই দিনটি হবে এমন যেন সবেমাত্র সে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে, অর্থাৎ রোযাদার তার সকল গুণাহ থেকে মুক্তি পেয়ে নিষ্পাপ শিশুটির মতো হয়ে যাবে।

 আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের প্রতি এ যে কতো বড়ো রহমত, কতো বড় বিশাল এক অনুগ্রহ তা বোঝানো সম্ভব নয়। কেবল অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করার বিষয় এটি। নবী কারিম (সাঃ) বলেছেন, যখনই রমযানের শুভাগমন ঘটে, তখনি আল্লাহর রহমতের দরোজাগুলো খুলে যায় আর জাহান্নামের দরোজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সেইসাথে শয়তানকে লোহার জিঞ্জীর বা শেকলে আবদ্ধ করা হয়। এই হাদিস থেকে যে বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে তাহলো, রমযান ব্যতীত এগারোটি মাসেও আমরা আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করার চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনার কারণে অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ইবাদাত করা হয়ে ওঠে না। এই মাসে যেহেতু শয়তানকে আটকে রাখা হয়, তাই তার মাধ্যমে প্ররোচিত হবার কোনো আশঙ্কা নেই ফলে যতো খুশি ইবাদাত করার সুযোগ রয়েছে এই মাসে। সুবর্ণ এই সুযোগকে আমরা যেন কোনোভাবেই কাজে লাগাতে ব্যর্থ না হই-সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। কিন্তু কী কর্মসূচি থাকতে পারে এই মাসে, এবার সেই প্রসঙ্গে অলী-আওলিয়াদের সংক্ষিপ্ত দিক-নির্দেশনা তুলে ধরা যাক। আহলে বাইতের মহান ইমামগণ রমযানের দৈনন্দিন করণীয় সম্পর্কে চমৎকার দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। এমনকি কীভাবে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে-তারও নির্দেশন রেখে গেছেন তাঁরা।


বেহেশত হলো আল্লাহর ইবাদাত বা আনুগত্যকারীদের পুরস্কার। রোযাও আল্লাহর দেয়া অবশ্য পালনীয় দায়িত্বগুলোরই একটি। রমযান মাসের এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরো কিছু ইবাদাত অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। যেমন- কোরআন তেলাওয়াত করা, এহসান বা দয়াপরবশ হওয়া, দান-খয়রাত করা, তওবা এস্তেগফার করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভে যোগ্য সকল গঠনমূলক ইবাদাত এ মাসের অবশ্য করণীয় কিছু দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সন্তুটিষ্ট অর্জন করার এবং নৈতিক চরিত্র গঠন করার সৌভাগ্য দিন। যেমনটি হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, ‘ আল্লাহ আমাদের ওপর রোযা ফরজ করেছেন, নৈতিক চরিত্র গঠনে শিক্ষা দেয়ার জন্যে। সেই শিক্ষা যাতে আমরা পেতে পারি এবং তা কাজে লাগাতে পারি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।