Wednesday, July 9, 2014

সূরা হজ্ব ৪১ আয়াত

সূরা হজ্ব ৪১ আয়াত

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহীম।

অনুবাদ
তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহ্র ইখতিয়ারভুক্ত। (সূরা হজ্ব-৪১ আয়াত)
শানে নুযুল
হিজরতের পর পরই আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়। মক্কার কাফিরদের সীমাহীন নির্যাতনের পর রাসূল (সা.) সাহাবীদেরকে নিয়ে মদীনায় হিজরীত করার পর পরই দীনের দাওয়াতের মুক্ত সুযোগ সৃষ্টি হলো। সুযোগ পাওয়ার সাথে সাথে মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ সকলেই নামায কায়েম, যাকাত প্রদান ও সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ প্রদান করা ইত্যাদি কাজসমূহ অত্যমত্ম যত্নসহকারে পালন করতে থাকেন। তাঁদেরই প্রশংসা করে আল্লাহ্ তায়ালা আলোচ্য আয়াতখানা অবতীর্ণ করেন।
(তাফসীরে ইবনে কাছির, ৪/২৭৭)
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা বিপদ মুছিবত থেকে মুক্ত করেন, নিশ্চিমত্ম চলার জন্য ব্যবস্থা করে দেন এবং জমিনের বুকে শামিত্ম-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা সহকারে অবস্থানের সুযোগ দেন তারা মৌলিক চারটি কাজ করবে (১) নামায প্রতিষ্ঠা করবে (২) যাকাত প্রদান করবে (৩) সৎ কাজের আদেশ ও (৪) লোকদেরকে অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করবে।
প্রথমত নামায কায়েম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘তারা নামায কায়েম করবে। নামায কায়েম বলতে রুকু, সিজদা ঠিকমত আদায় করবে। জামায়াত সহকারে নামায আদায় এবং নামাযের শিক্ষা সমাজে বাসত্মবায়ন করাকে বুঝায়।’’
(তাফসীরে বায়জাবি, ১ঃ৮)
আয়াতে শুধুমাত্র নামায আদায় করতে আল্লাহ্ বলেননি বরং নামায কায়েম করতে বলা হয়েছে। জামাতে নামায আদায়; অন্য মুসলমান ভাইদেরও তাতে শরীক করার কথা বলা হয়েছে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, দীনের মূল হল তাওহীদ আর নামায হল তার সত্মম্ভ। (তিরমীযি)
মুয়াত্তা মালেকে হযরত ওমর (রা.) একটি বর্ণনা এসেছে, ‘‘আমার কাছে নামায সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি নামায হেফাজত করল (কায়েম করল) সে গোটা দীনের হেফাজত করল, আর যে নামায নষ্ট করল সে সব কিছুই নষ্ট করে ফেলল।’’
উল্লেখিত হাদীস সমূহ থেকে স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছে যে, ইসলামের মধ্যে নামাযের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ জন্য কুরআন মজিদের অনেক জায়গায় নামাযের ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে নামায কায়েম করতে বলেছেন।
নামাযের সময় ও পদ্ধতি
নামায আদায়ের সময় ও পদ্ধতি কুরআন এবং হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চয় নামাজের সময় মুমিনদের জন্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। (সূরা নিসা, ১০৩)
নামাযের পদ্ধতি সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, আমাকে যেভাবে নামায আদায় করতে দেখবে, সেভাবেই নামায পড়বে। (বুখারী ও মুসলিম)
ধীরে সুস্থে সুন্দর করে নামায পড়তে হয়। তাড়াহুড়ো করে নামায পড়লে নামাযের রুকন ও শর্তগুলো ভালো করে আদায় হয় না। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল (সা.) নামাযে কুরআনের আয়াতগুলোকে খন্ড খন্ড করে একের পর এক আয়াত পড়তেন। (তিরমীযি)
রাসূল (সা.) এক বেদুঈনকে তাড়াহুড়া করে নামায আদায় করায় পুনরায় নামাযের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘‘পুনরায় নামায পড়, কেননা তোমর নামায হয়নি।’’
(বুখারী ও মুসলিম)
এভাবে তিনবার তাকে পুনরায় নামায আদায়ের নির্দেশ দেন। নামাযে রুকু, সিজদাগুলোকে সুন্দর করে আদায় করার প্রতি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রশামিত্মর সাথে সিজদা করো।’’ (বুখারী)
রুকু সিজদা সঠিকভাবে আদায় না করলে নামায সহীহ তো হয়ই না বরং বলা হয়েছে, সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি যে নামায চুরি করে।
সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল, নামাযে আবার কিভাবে চুরি করবে? উত্তরে রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে নামাযে রুকু, সিজদা ঠিকমত আদায় করে না, সেই বড় চোর। (তাবারানী)
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, মুমিনরাই সফলকাম। যারা নামাযে ভীতি ও বিনয় অবলম্বন করে। (সূরা মুমিনুন, ২)
পক্ষামত্মরে নামাযে উদাসীনদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যারা নামাযে অমনোযোগী ও উদাসীন থাকে ঐ মুসল্লিদের জন্য ধ্বংস অবধারিত। (সূরা মাউন, ৪)
দ্বিতীয়ত সত্যিকার ঈমানদারগণ সুযোগ হলেই নামায কায়েমের পরপরই যাকাত আদায় করবে। যাকাত আদায় আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ধনীদের মালের মধ্যে নির্ধারিত পরিমাণে গরিব মিসকীনদের জন্য অধিকার সাব্যসত্ম করা হয়েছে। এটা গরীবদের ওপর দয়া বা অনুগ্রহ নয় বরং যাকাত তাদের পাওনা বা অধিকার। আল্লাহ্ তায়ালার বাণী- তোমাদের সম্পদের মধ্যে অসহায় ও গরীবদের জন্য অধিকার রয়েছে। (সূরা জারিয়াত, ১৯)
তৃতীয়ত সফলকাম ঈমানদারগণ সুযোগ পেলেই সৎ কাজের আদেশ দেয়াটাকে নিজের জীবনের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব হিসেবে নেবেন। দাওয়াত নিজের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের দিয়েই শুরু করবে। তাদেরকে নামাযে উদ্বুদ্ধ করবে, জামাতে শরীক হতে বলবে।
হাদীসে এসেছে, তুমি সুযাগ পেলেই তোমার দীনের দাওয়াত দিতে দিতে সার্বক্ষণিক ভাবে তোমার জবান সচল রাখো। (তিরমীযি)
চতুর্থত ‘‘অসৎ কাজের নিষেধ’’। অসৎ, গর্হিত, বিবেকবর্জিত, অসুন্দর কাজসহ সকল ধরনের অপরাধ ও দুর্নীতি চিরতরে নির্মূল করার জন্য সত্যিকার ঈমানদারগণ নিরলস প্রচেষ্টা চালাবে।
তাই আসুন আমরা সকলে নামায কায়েম করি এবং সামগ্রিক ভাবে জীবনের সকল অংশে নামাযের শিক্ষা বাসত্মবায়ন করি।

কুরআন সুন্নাহ্র আলোকে কবীরা গুনাহ

কুরআন সুন্নাহ্র আলোকে কবীরা গুনাহ

মূল : ইমাম শামসুদ্দীন উসমান আযযাহাবী (রাহ.)
অনুবাদ : মুহাম্মদ আবদুল হাই নদ্ভী
(সেপ্টেম্ব’১৩ইং সংখ্যার পর)
হযরত আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত। একদিন রাসূল (স.) তাঁর সহচরদের নিয়ে নামায পড়ে বসলেন। এ সময়ে এক ব্যক্তি এসে তাড়াতাড়ি রুকু সিজদা করে নামায পড়ল। রাসূল (স.) বললেনঃ তোমরা এ ব্যক্তিকে কি দেখতে পাচছ ? সে যদি এ অবস্থায় মারা যায় তাহলে মুহাম্মদ (স.)-এর উম্মতের বহির্ভূত অবস্থায় মারা যাবে। কাক যেমন তার ঠোঁট দিয়ে রক্তে ঠোকর মারে, সে যে রকম ঠোক মেরে নামায সমাপ্ত করল।
রাসূল (স.) আরো বলেছেনঃ কেউ যখনই নামায পড়ে তখন একজন ফেরেশতা তার ডানে এবং একজন ফেরেশতা তার বামে থাকে। সে যদি সুষ্ঠুভাবে নামায শেষ করে তাহলে তারা উভয়ে সে নামাযকে নিয়ে আল্লাহ্র কাছে পৌঁছায়। অথবা তারা তা তার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারে।’’ (দারে কুত্নী)
রাসূল (স.) আরো বলেছেনঃ যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে অযু করে, এরপর নামাযে দাঁড়িয়ে, সুষ্ঠুভাবে রুকু সিজদা ও কুরআন পাঠ দ্বারা নামায সম্পন্ন করে, তার নামায তাকে বলেঃ তুমি যেমন আমাকে সংরক্ষণ করেছ, তেমনি আল্লাহ্ তোমাকে রক্ষা করুন। এরপর তা আলোকরশিম ছড়াতে ছড়াতে আকাশের দিকে উঠে গেলে তার জন্য আকাশের দুয়ার খুলে যায় এবং আল্লাহ্র কাছে পৌঁছে দিয়ে এ নামাযীর পক্ষে সুপারিশ করে। আর যখন রুকু সিজদা ও কুরআন তেলাওয়াত সুষ্ঠুভাবে করে না তখন নামায তাকে বলেঃ তুমি যেমন আমাকে বিনষ্ট করলে, আল্লাহ্ও তেমনি তোমাকে বিনষ্ট করুন। এরপর তা অন্ধকারে আচ্ছন্ন অবস্থায় আকাশে উঠে যায়। তখন তার জন্য আকাশের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তাকে পুরানো কাপড়ের মত গুটিয়ে নামাযীর মুখের ওপর ছুড়ে মারা হয়।
রাসূল (স.) আরো বলেছেনঃ নামায হচ্ছে একটি দাঁড়িপাল্লা স্বরূপ। যে ব্যক্তি এ দাঁড়িপাল্লায় পুরোপুরিভাবে মেপে দেয়, তাকে তার পুরস্কারও পুরোপুরি-ভাবে প্রদান করা হবে। আর যে মাপে কম দেবে, তার সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে, যারা মাপে কম দেয় তাদের জন্য ‘ওয়েল’ নির্দিষ্ট রয়েছে। মাপে কম দেয়া যেমন অন্যান্য বস্ত্ত হতে পারে, তেমনি নামাযেও হতে পারে। আর ‘ওয়েল’ হচ্ছে জাহান্নামের এমন উত্তপ্ত জায়গা, যার উত্তাপ থেকে জাহান্নাম নিজেও আল্লাহর কাছে পরিত্রাণ কামনা করে। (মুসলিম, আহমদ)
রাসূল (স.) বলেছেনঃ সিজদার সময় তোমরা মুখাবয়ব, নাক ও দুই হাত মাটিতে রাখবে। কেননা আল্লাহ্ তাআলা আমাকে সাতটি অঙ্গের মাধ্যমে সিজদা করতে আদেশ দিয়েছেন। কপাল, নাক, দুই হাতের তালু, দুই হাঁটু ও দুই পায়ের পিঠ। সিজদার সময়ে কাপড় ও চুল সামলাতে নিষেধ করেছেন। যে ব্যক্তি প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে তার অধিকার না দিয়ে নামায পড়ে, তাকে সংশ্লিষ্ট অঙ্গ সম্পূর্ণ নামাযের সময় ধরে অভিশাপ দিতে থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত হুযাইফা (রা.) এক ব্যক্তিকে দেখলেন ভালভাবে রুকু সিজদা না করে নামায পড়ছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এভাবে কতদিন যাবত নামায পড়ছ ? সে বললঃ চল্লিশ বছর। তিনি বললেনঃ তুমি চল্লিশ বছর যাবত কোন নামায পড়নি। এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তুমি অমুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলতেন, ‘‘হে আদম সন্তান! নামায যদি তোমার কাছে গুরুত্বহীন কাজ বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে ইসলামের আর কোন কাজটি তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে? অথচ রাসূল (স.) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন বান্দা সর্বপ্রথম নামাজ সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হবে। সে যদি সঠিকভাবে নামাজ পড়ে তাহলে মুক্তি পাবে। আর যদি নামায সুষ্ঠুভাবে না পড়ে, তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি ফরয নামাযে অসম্পূর্ণতা ধরা পড়ে, তাহলে আল্লাহ্ বলবেন, ‘‘দেখ, আমার বান্দার কোন নফল কাজ রয়েছে কিনা? যদি থাকে তাহলে তা দিয়ে ফরযের ত্রুটি পরিপূর্ণ কর। অনুরূপভাবে সকল কাজের বিচার অনুষ্ঠিত হবে।’’ (তিরমিযী)
এ জন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত যত সম্ভব বেশি বেশি নফল আদায় করা, যাতে ফরযের ক্ষতিপূরণ করা যায়। এ কাজটা খুব গুরুতর কাজ নয়- ইচ্ছা থাকলেই করা যায়। অনর্থক সময় নস্ট না করে এ কাজে মনযোগী হওয়া উচিত।

যাকাতের উদ্দেশ্য এবং দাতা ও গ্রহীতার জীবনে তার প্রভাব : মুফতি তাকি ওসমানী

যাকাতের উদ্দেশ্য এবং দাতা ও গ্রহীতার জীবনে তার প্রভাব : মুফতি তাকি ওসমানী

TK copy
যাকাত ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির অন্যতম একটি ভিত্তি। যাকাত ওয়াজিব করার দ্বারা ইসলামের লক্ষ্য শুধু ধন-সম্পদ সংগ্রহ করা এবং রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করাই নয়। অভাবী ও দুঃখী মানুষের শুধু অভাব ও দুঃখ দুর্দশা দূর করা উদ্দেশ্য নয়; বরং তার প্রথম লক্ষ্য দাতার জীবনে বিস্তর কার্যকরি প্রভাব ফেলা, তাকে বস্তুগত চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠানো, তার ভিতরকার মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করা, ইত্যাকার নানাবিধ উপকারিতা ও প্রভাব রয়েছে যা দাতার জীবনে পরিলক্ষিত হয়। আমরা তা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
১. যাকাত অন্তরকে লোভের কলুষতা হতে পবিত্র করে একজন কালেমাধারী মুসলমান যখন বৈষয়িক চিন্তার ঊর্ধ্বে ওঠে শুধু আল্লাহর হুকুম পালন ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে যাকাত দেয়, সে যাকাত তাকে পাপাচারের পঙ্কিলতা, গোনাহের কলুষতা এবং বিশেষভাবে লোভ ও কার্পণ্যের হীনতা, নীচতা ও সঙ্কীর্ণতা হতে পবিত্র করে, মুক্তি দেয়। কেননা, মানুষের মধ্যে রয়েছে আত্মপ্রেম এবং ধন-সম্পদের মালিক হওয়া, লিপ্সা, স্পৃহা ও দুনিয়ায় স্থিতি লাভের প্রেরণা। এসব প্রকৃতিগত ভাবধারার লক্ষ্য ও প্রকাশক হচ্ছে ব্যক্তির লোভ ও কার্পণ্য। তাইতো মানুষের মাঝে রয়েছে অন্য মানুষের তুলনায় নিজেকে বেশি বেশি কল্যাণ, মুনাফা ও সুবিধার দৌলতে সমৃদ্ধ করে তোলার কামনা ও বাসনা। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেছেনÑ
قُل لَّوْ أَنتُمْ تَمْلِكُونَ خَزَائِنَ رَحْمَةِ رَبِّي إِذًا لَّأَمْسَكْتُمْ خَشْيَةَ الْإِنفَاقِ وَكَانَ الْإِنسَانُ قَتُورًا
‘বলুন যদি আমার পালনকর্তার রহমতের ভাণ্ডার তোমাদের হাতে থাকত, তবে ব্যয়িত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অবশ্যই তা ধরে রাখতে। মানুষ তো অতিশয় কৃপণ।’ [সূরা বনি ইসরাইল : ১০০]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে- ‘মনকে কার্পণ্য ও লোভ পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে।’ [নিসা : ১২৮]
আর এ লোভ ও কার্পণ্য একটা কঠিনতর বিপদ, ব্যক্তির জন্যও যেমন- সমাজের জন্যও তেমন। লোভ ও কার্পণ্য মানুষকে রক্তপাতের দিকে তাড়িত করে, দীন-ধর্ম লঙ্ঘন করতে ও দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে শত্র“র হাতে বিক্রি করে দিতেও প্ররোচিত করে। এমনকি নিজের মান-মর্যাদা, ইজ্জত-আব্র“ ভূলুণ্ঠিত হওয়ার কারণ ঘটায়।
তাই যারা লোভ ও কার্পণ্য থেকে বেঁচে থাকতে পারবে তারা সফল ও কৃতকার্য। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ
وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘যারাই তাদের মনের লোভ ও কার্পণ্যকে রোধ করতে সক্ষম হবে, তারাই কল্যাণধন্য ও সফলকাম হবে। [হাশর : ৯, তাগাবুন : ১৬]
মনের সে লোভ ও কার্পণ্য হতে যাকাত মানুষকে পরিত্রাণ ও মুক্তি দেয়। সে মুক্তি মালের বন্ধনের জিল্লতি হতে, মনের কাতরতা ও অধঃগতি থেকে, টাকা-পয়সার দাসত্বের হীনতা ও নীচতা থেকে।
কেননা, ইসলাম চায় একজন মুসলমান সবকিছুর অধীনতা-আনুগত্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহর বান্দা হোক। এ বিশ্বচরাচরে যা কিছু আছেÑ বস্তুগত উপাদান, উপকরণ ও দ্রব্যসামগ্রীÑ মানুষ সে সবকিছুর কর্তা ও নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়াক। আল্লাহ মানুষকে দুনিয়াতে তাঁর প্রতিনিধি ও সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন, কিন্তু সে শুরু করে দিয়েছে নফসের দাসত্ব, বস্তু ও সম্পদের উপাসনা-এর চাইতে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে? আর যাকাত সেই অন্তরকে লোভ-লালসার কলুষতা থেকে মুক্তি দেয়।
২. যাকাত দানশীলতার অভ্যাস গড়ে তোলে।
যাকাত যেমনি মুসলমানের অন্তরকে লোভের কলুষতা থেকে পবিত্র করে, তেমনি তা দানশীলতা, খরচ করা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকারের অভ্যাস গড়ে তোলে। একথা সর্বজনবিধিত যে, অভ্যাসের বিরাট প্রভাব রয়েছে মানুষের চরিত্রে, আচার-আচরণে ও তার লক্ষ্য নির্ধারণে। একারণেই বলা হয়ে থাকে ‘মানুষ অভ্যাসের দাস এবং অভ্যাস দ্বিতীয় প্রকৃতি’ অর্থাৎ মানুষের মাঝে অভ্যাসের একটা শক্তিশালী ও কার্যকরী আধিপত্য রয়েছে, যা মানুষের সৃষ্টিগত প্রকৃতির অনুরূপ দৃঢ় হয়ে থাকে।
যে মুসলমান ফসল কাটার সাথে সাথেই তার যাকাত, ওশর বা খারাজ দিয়ে দেয়, তার গবাদি পশু; ব্যবসায়িক পণ্য ও অন্যান্য আয়ে বছর পূর্ণ হতেই যাকাত দিতে অভ্যস্ত হয়, ঈদুল ফিতরের নামাযের পূর্বেই ফিতরা দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করে, এ মুসলমান দানশীলতা ও অর্থব্যয়ের মৌলিক গুণের অধিকারী হয়ে যায়। তার এ চরিত্র প্রকৃতির গভীরে শিকড় গেড়ে মজবুত অবস্থান নেয় এবং এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়ে।
এ কারণে এ চরিত্রটি কুরআনের দৃষ্টিতে মুত্তাকি, পরহেযগার-মুমিনের অন্যতম গুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যখন মহাগ্রন্থ আল কুরআন খুলে বসে ও  প্রথম সূরা আল-ফাতিহা পাঠের পর পরবর্তী পৃষ্ঠার দিকে তাকায় সূরা আল-বাকারা পাঠের উদ্দেশে, সেখানে মুত্তাকিদের গুণাবলি চোখে পড়ে। ইরশাদ হচ্ছেÑ
الم [٢:١]ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ [٢:٢]الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ [٢:٣]
‘আলিফ-লাম-মিম, এ সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা মুত্তাকিদের জন্যে হেদায়াত। (মুত্তাকি) তারা, যারা গায়বের প্রতি ঈমান রাখে, নামায কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ [সূরা বাকারাহ-১-৩]
এছাড়াও পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শুরা আয়াত ৩৬, ৩৭। সূরা বাকারা আয়াত-৩২৭, আলে ইমরান আয়াত-১৭, ১৩৪। আয যারিয়াত আয়াত- ৩১৫, ১৯, মাআরিয আয়াত-১৯-২৪, সূরা আল লায়ল আয়াত-১-২১, এসব আয়াতে এবং অন্যান্য আয়াতে এ বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে বিধৃত হয়েছে।  এ বিষয়ে তাফসীরের কিতাবসমূহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। উৎসুক পাঠক তা থেকে উপকৃত হতে পারেন।
৩. যাকাতদাতা আল্লাহর চরিত্রে ভূষিত হয়
মানুষ যদি কার্পণ্য ও লোভ থেকে পবিত্র হতে পারে, দান-ব্যয় ও ত্যাগ স্বীকারে অভ্যস্ত হতে পারে, তাহলেই সে মানবীয় লোভের পঙ্কিলতা থেকে ঊর্ধ্বে ওঠতে পারে, আল্লাহপ্রদত্ত উচ্চতর পূর্ণাঙ্গ গুণাবলিতে ভূষিত হতে পারে। কেননা, মহান আল্লাহ তাআলার অসীম গুণাবলির অন্যতম হচ্ছেÑ কল্যাণ, রহমত, অনুগ্রহ ও দয়াবর্ষণ। এ গুণাবলি অর্জনের উদ্দেশে মানবীয় শক্তি সামর্থ্যানুযায়ী চেষ্টা করে আল্লাহর চরিত্রে ভূষিত হওয়া একান্ত আবশ্যক। আর তাই হচ্ছে মানুষের উন্নতি ও উৎকর্ষের চরমতম মান।
ইমাম আল রাযি বলেন, মানুষ যে ‘নফসে নাতেকার’ দরুন মানুষ হয়েছে, তার দু’টি শক্তি: ১.আকিদা বা বিশ্বাসগত এবং ২.আমলি বা বাস্তব কর্মগত। বিশ্বাসগত শক্তির পূর্ণত্ব নিহিত রয়েছে আল্লাহর আইন-কানুনের বড়ত্ব স্বীকার ও তাঁর প্রতি মর্যাদা দানে। আর বাস্তবÑকর্মগত শক্তির পূর্ণত্ব নিহিত রয়েছে আল্লাহর সৃষ্টিকুলের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য করাতে। একারণে আল্লাহ তাআলা যাকাত ফরজ করেছেন, যাতে আত্মার মৌলশক্তি এই পূর্ণত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়। এই তত্ত্বকে সামনে রেখেই তাফসীর কবীরে উল্লেখ হয়েছে Ñ‘তোমরা সকলে আল্লাহর চরিত্রে ভূষিত হও।’ [তাফসিরে কাবির : ১০১/১৬]
উল্লেখিত কথাটি কোন হাদীস নয়, তবে হুযূর সা. এর একটি হাদীসের ভাবার্থ যা রাসূলের আখলাক নিয়ে হযরত আয়েশা রা. কে প্রশ্ন করায় তিনি বলেছিলেন, রাসূলের চরিত্র হলো আল কুরআন। যেহেতু পবিত্র কুরআন আল্লাহর কালাম। আর আল্লাহর কালাম আল্লাহরই অংশ। তাই রাসূলেরমত তোমরাও আল্লাহর চরিত্রে অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত চরিত্রে ভূষিত হও।
৪. যাকাত প্রদান খোদাপ্রদত্ত নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
সুন্দরকে সুন্দর বলা এবং নেয়ামতের শোকর- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একান্ত অপরিহার্য। এটা বিবেক ও নৈতিকতার দাবি এবং সকল ধর্ম ও আইন একথার সমর্থন যোগায়।
‘যাকাত’ স্বীয় দাতার মন-মানসিকতায় আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার ভাবধারা জাগিয়ে তুলে। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালি রহ. লিখেনÑ ‘আল্লাহর অফুরন্ত ও অজস্র নেয়ামত রয়েছে তাঁর বান্দাদের মনে ও ধনে। দৈহিক ইবাদতসমূহ দৈহিক নেয়ামতের শোকর আর আর্থিক ইবাদতসমূহ আর্থিক নেয়ামতসমূহের শোকর। [ইহ্ইয়াও উলমুিদ্দনÑ ১৯৩/১]
বস্তুত, যাকাত হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামতের বিনিময়। প্রতিটি নেয়ামতের বিনিময়ে মানুষকে যাকাত দেওয়া একান্ত আবশ্যক। সে নেয়ামত বস্তুগত হোক বা তাৎপর্যগত। একারণে বলা হয়ে থাকে; ‘তুমি তোমার সুস্থতার যাকাত দাও, তোমার দৃষ্টিশক্তির যাকাত দাও, তোমার জ্ঞানের যাকাত দাও, তোমার সন্তানের যাকাত দাও’Ñ এ ভাবধারা মুসলমানের অন্তরে জেগে ওঠা প্রয়োজন। হাদীসেও বলা হয়েছেÑ প্রত্যেকটি জিনিসেরই যাকাত রয়েছে। আর শরীরের যাকাত হচ্ছে রোযা।
৫. যাকাত দুনিয়াপ্রেমের চিকিৎসা
আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য মাল উপার্জন ও সঞ্চয় করাকে মুবাহÑ জায়েয করে দিয়েছেন। দুনিয়ার যাবতীয় পাক-পরিচ্ছন্ন ও হালাল জিনিসই তার জন্য জায়েয। কিন্তু একেই জীবনের একমাত্র চিন্তাÑধারার বিষয় ও চরম লক্ষ্যরূপে গ্রহণ করতে আল্লাহ কখনো রাজি নন। কেননা, মানুষ তো এর চেয়েও অনেক উঁচু ও মহান উদ্দেশ্যের জন্য সৃষ্ট হয়েছে। তার জন্য নির্মিত হয়েছে চিরন্তন উদ্যান। এ বিশ্ব চরাচর মানুষের জন্যই সৃষ্ট। আর সে নিজে সৃষ্ট পরকাল তথা আল্লাহর ইবাদতের জন্য। এ দুনিয়াটা তো পরকালের পথ। মানুষ এ পথকে সুন্দর সুসজ্জিত করে গড়ে তুলুক তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু হয়েছে উল্টো। মানুষ দুনিয়াতে এসে দুনিয়ার  মায়াজালে আটকে পড়েছে, দুনিয়াপ্রেমে বিভোর হয়ে গেছে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেনÑ
‘মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করছে নারী, সন্তান-সন্তুতি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। [সুরা আলে ইমরান : ১৩]
হাদীসে এসেছে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
‘দুনিয়ার ভালোবাসা সব অনিষ্টের মূল।’
মানুষ যখন দুনিয়ার পেছনে পড়ে যায়, দু’হাতে মাল কামাতে থাকে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বলতে চান : থাম! যা অর্জন করেছ, তা থেকে ব্যয় কর; দান করÑ এর মধ্যে আল্লাহর হক রয়েছে, তা বের কর। ফকীরের হক রয়েছে, তা পৃথক করে দাও। তখন দুনিয়াপ্রেমে বিভোর ব্যক্তির ঘোর কেটে যায়। দুনিয়ার মহব্বত দূরীভূত হতে থাকে। অতএব বলা যায়, যাকাত ফরজ করা হয়েছেÑ দিল থেকে দুনিয়া ও ধন-সম্পদের প্রেমরোগের সুনির্দিষ্ট ও সঠিক চিকিৎসা বিধানের লক্ষ্যে।
৬. যাকাত ধনীর ব্যক্তিত্ব বিকাশ করে
‘যাকাত’ ধনীর ব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধি ও তার অন্তর্নিহিত সত্তার বিকাশ সাধন করে। তাই যে ব্যক্তি কল্যাণের হাত প্রসারিত করে দান-খয়রাত করে, যাকাত দেয়, তার মধ্যে একটা প্রশান্তি, সম্প্রসারতা এবং তার বক্ষে উদারতা ও বিশালতা অনুভব করতে শুরু করে। যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার সুখ পায়। ওপরন্তু সে তার লালসা ও লোভের শয়তানকে দমন করতে সক্ষম হয়।
এটাই হচ্ছে মানসিক ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধন তথা আত্মিক ঐশ্বর্য লাভ। কুরআনের এই আয়াতের মধ্যে
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا
তাদের মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে। [সূরা তাওবা : ১০৩]
‘তাতহির’ ও ‘তাযকিয়া’ শব্দদ্বয় থেকে আমরা আত্মিক ঐশ্বর্য লাভ এ তাৎপর্য অনুধাবন করেছি। কেননা, আয়াতে ‘তাতহির’ ও ‘তাযকিয়া’ শব্দদ্বয় ‘এবং’ বলে আনা হয়েছে। যা থেকে উপর্যুক্ত তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে উঠে।৭. যাকাত ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে
যাকাত ধনী এবং তার সমাজের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করে, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি, সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব উদ্ভাবন করে, যা অত্যন্ত দৃঢ় ও দুñেদ্য হয়। কেননা, মানুষ যখন অন্য কারো সম্পর্কে জানতে পারে যে, সে তার জন্য যা ক্ষতিকর তা দূর করতে চায়, তাহলে সে তাকে ভালোবাসবে স্বাভাবিকভাবেই, তার মন-মানস তার প্রতি আকৃষ্ট হবে অনিবার্যভাবে। এজন্য হাদীসে বলা হয়েছে Ñ ‘যে লোক যার কল্যাণ করল, তার দিলে তার প্রতি স্বভাবতই ভালোবাসা জাগবে। আর যে তার অকল্যাণ করেছে, তার প্রতি স্বভাবতই জাগবে অসন্তোষ ও ক্রোধ।’
ফকির-মিসকিনরাও যখন জানবে যে, এ ধনী ব্যক্তি তার ধন-মালের একটা অংশ তাকে দিবে, তখন তারা তার জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করে। সে সব  দোআ, আন্তরিক শুভেচ্ছা সে ব্যক্তির সর্বক্ষণ কল্যাণকর ও মহানুভবতার কাজে নিমগ্ন থাকার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
৮. যাকাত সম্পদের পবিত্রতা সাধন করে
‘যাকাত’ যেমনি অন্তরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে. তেমনি তা ধনী ব্যক্তির ধন-মালের পবিত্রতা সাধন করে, প্রবৃদ্ধি ঘটায়।যাকাত মালকে পবিত্র করে এভাবে যে, মালের সাথে অপর লোকের মাল মিলেমিশে থাকলে তা কলুষিত হয়। অপরের মাল বের করে না দেওয়া পর্যন্ত তা পবিত্র হতে পারে না। এদিকে লক্ষ্য রেখেই পূর্বকালের কেউ বলেছেনÑ ‘অপহৃত ইট কোনো দালানে থাকলে তার ধ্বংস তাতেই রয়েছে।’ অনুরূপভাবে ফকির-মিসকিনের যে পয়সা ধনীর মালের সাথে মিশে রয়েছে, তার সবটুকুই তাতে কলুষিত হয়ে গেছে। এ কারণেই নবী কারীম সা. বলেছেনÑ ‘তুমি যখন তোমার মালের যাকাত দিয়ে দিলে, তখন তুমি তা থেকে খারাবিটা দূর করে দিলে।’
৯. যাকাত দিলে মাল কমে না, বাড়ে
যাকাত দেওয়ার দ্বারা মালের মধ্যে বরকত হয়। মাল বাড়ে, কমে না। কেননা, যাকাতবাবদ প্রদেয় এ সামান্য অংশ তার কাছে কয়েকগুণ বেশি হয়ে ফিরে আসে। এটা কখনও সে জানতে পারে, আবার কখনো জানতে পারে না। দেখুন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ
قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ وَمَا أَنفَقْتُم مِّن شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
‘বলুন! আমার পালনকর্তা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং সীমিত পরিমাণে দেন। তোমরা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার স্থলাভিষিক্ত বানান। তিনি উত্তম রিযিকদাতা। [সূরা সাবা : ৩৯]
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেÑ
‘শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদেরকে নিজের পক্ষ হতে ক্ষমা  ও বেশি অনুগ্রহের প্রতিশ্র“তি দিচ্ছেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।’ [বাকারা : ২৬৮]
সূরা রুমে দেখুন Ñ
وَمَا آتَيْتُم مِّن زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ
‘আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তোমরা যে যাকাত দাও; তারা দ্বিগুণ লাভ করে।’ [সূরা রুম : ৩৯]
অপর স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন Ñ
‘আল্লাহ তাআলা সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন, এবং দান-খয়রাতকে বর্ধিত করেন।’ [সূরা বাকারা : ২৭৬]
এসব আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহর রাস্তায় যা দেওয়া হয় তার কয়েক গুণ প্রদান করাই আল্লাহ তাআলার রীতি। এর অন্যথা হতে পারে না।
১০. যাকাত তার গ্রহণকারীকে অভাবগ্রস্ততা থেকে মুক্তি দেয়
যাকাত তার গ্রহণকারীকে অভাবগ্রস্ততা থেকে মুক্তি দেয়। ইসলাম চায় মানুষ অতীব উত্তম ও পবিত্র জীবন-যাপন করুক। উপর থেকে অবতীর্ণ নেয়ামতসমূহ এবং নিচ থেকে প্রাপ্ত সম্পদসমূহ আয়ত্ত করে তারা ধন্য হোক। যাতে পরম শান্তি ও সমৃদ্ধিতে তাদের দিন কানায় কানায় ভরে যাবে, আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতায় তাদের মন ও জীবন ভরপুর হয়ে উঠবে।
দারিদ্র্যের যন্ত্রণায় জর্জরিত হোক কোনো মানুষ, তা ইসলামের কাম্য নয়। কিন্তু সে দারিদ্র্য যদি বণ্টন ব্যবস্থার ত্রুটি ও সামষ্টিক জুলুম, নিপীড়ন ও বঞ্চনার দরুন হয়, তাহলে দারিদ্র্যের সাথে ইসলামের শত্র“তা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ তীব্রতর হয়ে উঠে।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা যাকাত ফরজ করেছেন। যা ধনী লোকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং দরিদ্রদের মাঝে তা বিতরণ করা হবে। তা পেয়ে অভাবী মানুষ তাদের প্রয়োজন ও অভাব-অনটন দূর করবে, খাবার, পানীয়, বস্ত্র ও বাসস্থানের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিবে। এর মাধ্যমে তারা আনুগত্য ও অনুসরণে লিপ্ত হবে।
বিত্তশালী মানুষদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, স্বীয় যাকাত দিয়ে ফকির-মিসকিনদের কোনোরূপ অপমান-লাঞ্ছনা দেওয়া, তাদের অনুভূতিতে আঘাত হানা, তাদের ওপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করা থেকে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেনÑ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَىٰ كَالَّذِي يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাতকে নষ্ট করো না, সে ব্যক্তির মতো যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো যার ওপর কিছু মাটি পড়েছিল। তারপর এর ওপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল।’ [বাকারা : ২৬৪]
১১. যাকাত হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে
যাকাত হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা থেকে দাতা ও গ্রহীতা উভয়কে রক্ষা করে। দারিদ্র্যের যাতাকলে পিষ্ট ও অভাবের যাতনায় ক্লিষ্ট অভাবী মানুষ যখন নিজের চতুর্দিকের মানুষকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করতে দেখে, তখন এ ব্যক্তির অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষের বিষবাষ্প জন্মাবে। তার দিলে পরশ্রীকাতরতা জাগবে। তার অন্তরে বিত্তশালীদের প্রতি চরম ঘৃণা সৃষ্টি হবে। কেননা, একজন বাস করছে পাঁচ তলায়, অন্যজন গাছতলায়।
ইসলাম গরীব-ধনীর ভেদাভেদকে হ্রাস করতে চায়। পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের স্থায়ী বন্ধন গড়ে তুলতে চায়। তাই হাদীসে এসেছেÑ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই।’ [বুখারি, মুসলিম]
কিন্তু এক ভাই যদি পেট ভরে খায় আর অন্য ভাই অভুক্তের জ্বালায় ছটফট করতে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে কাক্সিক্ষত ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী হতে পারে না কখনো।
সেই ভ্রাতৃত্বকে কায়েম এবং গরীব-দুঃখীর হিংসা-বিদ্বেষ দূরীভূত করার জন্য ইসলাম যাকাত ফরজ করেছে। যেন বেকারের কর্মসংস্থান হয়, অক্ষম-উপার্জনহীন মানুষও বাঁচার নিরাপত্তা পায়, ঋণগ্রস্তের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা হয়, পথহারা নিঃস্ব পথিক আপন ঘরে ফিরে যেতে পারে। তখনই মানুষ প্রকৃত অর্থে অনুভব করতে পারবে- তারা পরস্পরে ভাই, একে অপরের অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক। প্রয়োজন ও অভাবের সময় বিত্তশালীদের মাল গরীবদের কাজে লাগে।
বস্তুত এমন পবিত্র পরিবেশেই ঈমানের ছায়া বিস্তার হওয়া সম্ভব। লোকদের মাঝে জাগতে পারে ভ্রাতৃত্ববোধ, ভালোবাসা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা।
রাসূলে কারীম সা. বলেনÑ
‘তোমাদের কেউ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে। (বুখারি, মুসলিম, তিরমিযী)
অনুবাদক : মুহাদ্দিস, প্রাবন্ধিক।

অর্থ না বুঝে কুরআন পড়া কি অনর্থক?

অর্থ না বুঝে কুরআন পড়া কি অনর্থক? 

- শাহ জালাল মুহাম্মদ

quran
কুরআনুল কারীম আল্লাহ তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ কালাম তথা সর্বোত্তম কথামালা ও বাণী চিরন্তন। যারা কুরআন পাঠ করে তারা স্বয়ং মহান আল্লাহর সাথে কথোপকথন করে। রাসূল সা. ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের কেউ তার প্রতিপালকের সাথে কথা বলতে চাইলে সে যেন কুরআন পড়ে।’ [আল বুরহান ফী তাজবীদীল কুরআন : ৩]
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো আমরা নিজেদেরকে আল্লাহপ্রেমিক দাবী করলেও অন্তরে আল্লাহর সাথে কথা বলতে অনীহা পেশ করি। প্রকৃত প্রেম ও ভালোবাসা তো তাকেই বলে যাতে প্রেমিক বিভিন্ন বাহানায় প্রেমাষ্পদের সাথে কথা বলার জন্য উপলক্ষ্য অন্বেষণ করতে থাকে।
হযরত মুসা আ.-কে আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করলেন, وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَا مُوسَىٰ “মুসা! তোমার হাতে কি?” উত্তরে কেবল লাঠি বলাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তো আল্লাহর নবী, আল্লাহর প্রকৃত প্রেমিক। তাই প্রিয়তমের সাথে কথা বলার সুবর্ণ সুযোগ লুফে নিয়ে লম্বা চওড়া উত্তর দিলেন- قَالَ هِيَ عَصَايَ أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا وَأَهُشُّ بِهَا عَلَىٰ غَنَمِي وَلِيَ فِيهَا مَآرِبُ أُخْرَىٰ “তিনি বলেন- এটা আমার লাঠি, আমি এর ওপর ভর দেই এবং এর দ্বারা আমার মেষের জন্য বৃক্ষপত্র ঝেড়ে ফেলি এবং এতে আমার জন্য কাজও চলে।” [সূরা ত্বাহা : ১৮]
তিনি প্রশ্নের জবাবের ওপর আরও তিনটি বিষয় বাড়িয়ে বলেছেন শুধুই প্রেমাষ্পদের ইশক ও মুহাব্বতের আতিশায্যে।
সারকথা হলো, প্রেমিক প্রেমাষ্পদের সাথে আলাপচারিতায় অকল্পনীয় স্বাদ উপপভোগ করে থাকে। অথচ এই মহামূল্যবান সুযোগ মুসলমানগণ ঘরে বসেই লাভ করতে পারে। যখনই ইচ্ছে হবে তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সৌভাগ্য অর্জন করে নিবে। রাসূল সা. বলেন, “কুরআন শরীফ তিলাওয়াত সর্বোত্তম ইবাদত।” [কানযুল উম্মাল : ২২৬৩]
হাদীসের ভাষ্যে বুঝা যায় নফল ইবাদত হিসেবে সর্বোত্তম হলো কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত। প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য কুরআন শিক্ষা করা এবং তিলাওয়াত করা।
মুহিউস সুন্নাহ হযরত মাও. আবরারুল হক হারদুঈ রহ. যিনি হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ. এর সর্বশেষ খলীফা। তিনি বলেন, ‘কুরআনের প্রতি পৃষ্ঠা তিলাওয়াতে কম করে হলেও পাঁচ হাজার নেকী লাভ হয়।’সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ আছে। যারা বলে ‘অর্থ না বুঝে কুরআন পড়া অনর্থক।’ নিজেরা তো কুরআন পড়েই না অন্যদেরও বেহুদা ও অযৌক্তিক যুক্তি দেখিয়ে কুরআন পড়তে নিষেধ করে। এতে শুধু নিজেরাই ধ্বংস হচ্ছে না সাধারণ মুসলমানদেরকেও জাহান্নামি বানাচ্ছে। কেননা নামায সহীহ হওয়া নির্ভর করে কুরআন সহীহ করে তিলাওয়াত করার ওপর। আর কুরআন বিহীন নামায কাউকে জান্নাতমুখী করতে পারে না।
হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ. এর নিকট এক ব্যক্তি এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে এলে তিনি খুব চমৎকারভাবে প্রশ্নের জবাব দেন। প্রশ্নটি ছিলো- “আমরা কুরআন বুঝি না এমতাবস্থায় না বুঝে পড়ে কী লাভ? অথবা বাচ্চাদেরকে তোতা পাখীর ন্যায় কুরআন পড়িয়ে কী ফায়দা? এরা তো অর্থ বুঝে না।” তখন হযরত থানভী রহ. কয়েকটি জবাব দেন। তিনি বলেন-
১. অর্থ বোধগম্য না হলে কেবল শাব্দিক পাছে লাভ নেই এই যুক্তিই তাদেরকে সংশয়ে ফেলে দিয়েছে। তাই এই অসার যুক্তির কারণে তিলাওয়াত ত্যাগ করে বসে আছে। প্রকৃতপক্ষে যুক্তির দাবিতে কেবল শব্দ নয় অর্থের জ্ঞানও অর্জন করা আবশ্যক। কিন্তু তারা শুধু অর্থের গুরুত্বারোপ করতে যেয়ে তিলাওয়াতের গুরুত্বকে উপেক্ষা করেছে। তাদের অনুধাবন করা উচিত অর্থ বুঝা শব্দ পাঠের অনুগামী। প্রথম বিষয় হলো শব্দের জ্ঞান। আর নীতি হলো, প্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রারম্ভিকও প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে। তাই “শাব্দিক তিলাওয়াত লাভহীন” এই ধারণা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তারা অর্থ বুঝে না বিধায় তাদের সন্তানদেরকে শৈশবে তিলাওয়াত না শিখিয়ে বড় হওয়ার পর তিলাওয়াত শিখাতে দেখলে তাদের ব্যাখ্যা মেনে নিতাম। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো অবস্থাতেই সন্তানদেরকে তিলাওয়াতের দীক্ষা দিচ্ছে না। এতে প্রতীয়মান হয় যে, তারা শাব্দিক তিলাওয়াতকে নি®প্রয়োজন মনে করছে এবং নি®প্রয়োজন প্রমাণ করার কোশেশও করছে।
২. প্রকৃতপক্ষে এ প্রশ্নটি কুরআন পাঠ থেকে দুরত্ব সৃষ্টির একটি অপকৌশলমাত্র। কেননা এরা তো বাহ্যতঃ মুসলমান। এজন্য তারা কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি অনীহা প্রকাশ করতে পারছে না। তারা একথা ভালভাবেই জানে, তিলাওয়াতকে গুরুত্বহীন বলা মাত্রই তাদের বিরূদ্ধে কুফর এর ফতোয়া আসতে পারে। তাই একটা মনগড়া নীতি বানিয়ে নিয়েছে ‘অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করলে কোন লাভ নেই।’
৩. কুরআন হিফাজতের ক্ষেত্রে শব্দাবলির হিফাজতের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই অর্থ ব্যতীত শব্দাবলিকেও হিফাজত করা আবশ্যক। আল্লাহ না করুক কোন জালিম সরকার লিখিত সমস্ত কুরআন জালিয়ে দিলেও একজন হাফিজে কুরআন তার স্মরণে রক্ষিত কুরআন দ্বারা পুনরায় লিখাতে পারবে। এক্ষেত্রে ছোটো একজন হাফিজ শিশুই যথেষ্ট। বড়দের প্রয়োজ নেই।
অভিজ্ঞতায় দেখা যায় শৈশবে কুরআন হিফজ করলে তা মজবুতভাবে স্মৃতিগত হয়; বয়ঃবৃদ্ধির পর হিফজ করলে মুখস্থ অক্ষুন্ন রাখা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এখন তাদের কথামত শৈশবে কুরআন শিখানোর প্রচলন বন্ধ করে দিলে পরিণামে দুনিয়া থেকে হাফিজে কুরআনের মহান ধারা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই যারা অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করাকে অনর্থক বলে মানুষকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করছে তারা স্বয়ং আল্লাহর বিরূদ্ধে লড়াই করছে।
৪. শব্দের প্রতি রাসূল সা. অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। তাই উম্মতের জন্যও শব্দের প্রতি গুরুত্বারোপ করা কর্তব্য। তিনি শব্দের প্রতি এতো বেশি গুরুত্ব দিতেন যে, অহী অবতরণকালে হযরত জীবরাঈল আ. এর সাথে দ্রুত আওড়াতেন। অথচ তাঁর স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিলো। এ থেকে তাঁর শব্দের প্রতি অসাধারণ আগ্রহ অনুধাবন করা যায়। এ ছাড়া রাসূল সা. এর শব্দের প্রতি এতো ব্যাকুল হওয়ার আর একটি প্রমাণ হলো তিনি নিজে তিলাওয়াতের পাশাপাশি অন্যের তিলাওয়াতও শুনতেন। একবার ইবনে মাসউদ রা.-কে বললেন, আমাকে কুরআন শুনাও। ইবনে মাসউদ রা. বললেন, আমি আপনাকে শুনাব! অথচ আপনার ওপরই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে? নবীজি সা. বললেন, আমি অপরের কাছ থেকে কুরআন শুনতে ভালোবাসি। [বুখারী : ৫০৪৯]
সুতরাং যারা বলেন অর্থ না জানলে কুরআন পড়ে লাভ নেই তাদের নিকট প্রশ্ন হচ্ছে, রাসূল সা. পূর্ণ কুরআনের হাফিজ এবং অর্থের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও কেন সাহাবীর তিলাওয়াত শুনতে চাইতেন? বুঝা গেল তিনি শাব্দিক তিলাওয়াতের প্রতিও অনুরাগী ছিলেন। তাই অন্যের পড়া শুনতে পছন্দ করতেন। এবং একথাও প্রমাণ হলো, অর্থ ছাড়া নিরেট শব্দ তথা তিলাওয়াতও মুখ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।
৫. তিলাওয়াতের মাধ্যমে পরকালীন সফলতা অর্জন হয়।  তাই ‘অর্থ না বুঝে কুরআন তিলাওয়াত অনর্থক’ মন্তব্য বোকামি বৈ কিছু নয়। অর্থ বুঝার প্রয়োজনীয়তা তো আপনাদের নিকট স্বীকৃত। বর্তমান যুগে মানুষ বিজ্ঞান প্রযুক্তি নির্ভর হওয়ায় এই উত্তরটি নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য অতি সহজ একটি দলীল। আর দীনদার লোকদের জন্য সহজবোধ্য আর একটি দলীল আছে। যারা কুরআন হাদীস বুঝতে চায় না তাদের নিকট এ উত্তর বিস্বাদ লাগবে। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, কুরআন সহীহশুদ্ধ তিলাওয়াত করলে প্রতি হরফে দশটি করে নেকী লাভ হয়। [আত তারগীব আত তারহীব : ২২২৯]
৬. কুরআনের শব্দাবলিই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন। তাঁর পক্ষ থেকে প্রথমত শব্দাবলিই এসেছে। তারপর অর্থ এসেছে শব্দের অনুগামী হয়ে। এসূত্রেই শব্দাবলি যদি দুর্বোধ্য ভাষায় অবতীর্ণ হতো তবুও সেটাই যথেষ্ট হতো। প্রিয়জনকে খাবারের কিছু দেয়া হলে তাতে দুটি আকর্ষণীয় বস্তু থাকে। একটি প্রেমাষ্পদের হাতের ছোঁয়ার স্বাদ। অপরটি ভক্ষণের স্বাদ। প্রেমের প্রচলিত রীতি অনুসারে প্রিয়জনের হাতের ছোঁয়াযুক্ত বস্তু নাগালে পাওয়াটাই আনন্দের উপলক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় প্রিয়জনের স্পর্শমাখা বস্তুটি ব্যবহার না করে স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেয়া হয়। অতএব আল্লাহ প্রেমিকদের আনন্দের উপলক্ষ্য হওয়ার জন্য কুরআনের শব্দাবলিই যথেষ্ট ছিলো। কারণ এগুলোই সর্ব প্রথম আল্লাহর সত্তা হতে নির্গত হয়ে অবতীর্ণ হয়। যেন এগুলোর অর্থই ছিলো না। পরে অবশ্য অর্থসহ অবতীর্ণ হওয়ায় দুটি স্বাদ একত্রিত হয়। সুতরাং অর্থের স্বাদ উপভোগের ছুতা দিয়ে শব্দের স্বাদ পরিত্যাগ করা অযৌক্তিক। উত্তরগুলো দিয়ে হযরত থানভী রহ. ঐসব লোককে সতর্ক করে দিলেন যারা নিজেরা তো কুরআন পড়েই না ওপরন্তু অন্যদেরকেও পড়তে বাঁধা দেয়। কুরআন হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য চিরস্থায়ী সংবিধান। এর মাধ্যমেই সবার জীবন গড়তে হবে। আর কুরআনের জন্য বিশুদ্ধ তিলাওয়াত এমনই এক শক্তি যা যে কোনো মানুষকেই প্রভাবিত করতে সক্ষম। তাইতো মক্কার কাফিররা প্রকাশ্যে কুরআনের বিরোধিতা করলেও রাতের বেলায় রাসূল সা. এর বাড়ির আড়ালে থেকে তাঁর কুরআন তিলাওয়াত শুনতো। সুতরাং যারা অর্থ না বুঝে কুরআন পড়াকে অনর্থক মনে করে তাদের উচিত কুরআনের ইতিহাস ভালোভাবে অধ্যয়ন করা। এবং না জেনে না বুঝে মুসলমানদেরকে বিভ্রান্তিতে না ফেলা। অন্যথায় আল্লাহর আদালতে জবাবদিহীর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তথ্যসূত্র : [মুফতী আমিনী রহ. এর তিলাওয়াতে কুরআন অবলম্বনে]
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুনন্ধরা, ঢাকা।

যে নারীর মাসিক শুরু হয়েছে তিনি লাইলাতুল কদরে কী কী ইবাদত করতে পারবেন?


যে নারীর মাসিক শুরু হয়েছে তিনি লাইলাতুল কদরে কী করবেন? তিনি কি ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল হয়ে তার সওয়াব বাড়াতে পারবেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে এই রাতে তিনি কী কী ইবাদত করতে পারবেন?


উত্তর :

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

যে নারীর মাসিক শুরু হয়েছে তিনি শুধু নামায, রোজা, বায়তুল্লাহ তওয়াফ ও মসজিদে ইতিকাফ ব্যতীত বাকী সমস্ত ইবাদত করতে পারেন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি রমজানের শেষ দশকে রাত জাগতেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত: “শেষ দশক প্রবেশ করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোমর বেঁধে নামতেন। তিনি নিজে রাত জাগতেন এবং তাঁর পরিবারবর্গকে জাগিয়ে দিতেন।”[সহীহ বুখারী (২০২৪) ও সহীহ মুসলিম (১১৭৪)] 

ইহইয়াউল লাইল বা রাত জাগা শুধু নামাযের জন্য বিশিষ্ট নয়, বরং তা সকল ইবাদতের মাধ্যমে হতে পারে। আলেমগণ إِحْيَاء الليل কথাটিকে এই অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন।

ইবনে হাজার বলেছেন: “أحيا ليله” অর্থ- তিনি ইবাদত ও আনুগত্যের মধ্যে রাত জাগতেন।” নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “অর্থাৎ তিনি সালাত ও অন্য ইবাদতের মাধ্যমে গোটা রাত কাটিয়ে দিতেন।” 

আউনুল মাবূদ গ্রন্থে বলা হয়েছে: “অর্থাৎ নামায, যিকির-আযকার ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে (রাত কাটিয়ে দেয়া)।”

লাইলাতুল কদরে বান্দা যে যে ইবাদত করতে পারেন তার মধ্যে কিয়ামুল লাইল (রাতের নামায) সর্বোত্তম। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে বা ভাগ্য রজনীতে নামায আদায় করবে তার পূর্বের গুনাহসমূহ  মাফ করে দেয়া হবে।” [সহীহ বুখারী (১৯০১)ও সহীহ মুসলিম (৭৬০)]

যেহেতু যে নারীর মাসিক শুরু হয়েছে তার জন্য নামায আদায় করা নিষিদ্ধ তাই তিনি নামায ব্যতীত অন্য সব ইবাদত করার জন্য রাত জাগতে পারেন। যেমন:

১। কুরআন তেলাওয়াত করা, দেখুন (2564) নং প্রশ্নের উত্তর।

২। যিকির করা। যেমন: সুবহানাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল হামদু লিল্লাহ ইত্যাদি জপা। সুতরাং যে নারীর মাসিক শুরু হয়েছে তিনি বেশী বেশী সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহি ওয়াবি হামদিহি ওয়া সুবহানাল্লাহিল আযিম ই্ত্যাদি জপতে পারেন।

৩। ইস্‌তিগফার করা: তিনি বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি) পাঠ করতে পারেন।

৪। দোয়া করা: তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি করে দোয়া করতে পারেন এবং তাঁর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করতে পারেন। দোয়া হল সর্বোত্তম ইবাদতগুলোর অন্যতম। এটা এতবেশী গুরুত্বপূর্ণ যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেছেন:  “দোয়া ই হল- ইবাদত।”[জামে তিরমিযী (২৮৯৫), আলবানী ‘সহীহ আত-তিরমিযী’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন (২৩৭০)]

যে নারীর মাসিক শুরু হয়েছে তিনি লাইলাতুল ক্দরে উল্লেখিত ইবাদতগুলোসহ অন্যান্য ইবাদত পালন করতে পারেন।

আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যা পছন্দ করেন ও যাতে সন্তুষ্ট হন আমাদেরকে যেন তা পালন করার তাওফিক দেন এবং আমাদের নেক আমলগুলো কবুল করে নেন।

মহিলাদের অনিয়মিত মাসিক হলে কি করবেন!

মহিলাদের অনিয়মিত মাসিক হলে কি করবেন!


অনিয়মিত মাসিক হলে কি করবেন!অনিয়মিত ঋতুস্রাব নারীদের নিকট পরিচিত বিষয়। নারীদের মধ্যে অনেকেই অনিয়মিত মাসিক ও ঋতুস্রাব সমস্যায় ভোগেন। অনিয়মিত মাসিক ও ঋতুস্রাব একটি মেয়েলি সমস্যা৷ মাসিক সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হয়৷ অবশ্য কখনও কখনও দুই একদিন আগে পিছে হতে পারে৷ যদি ২১ দিনের আগে অথবা ৩৫ দিনের পর হয় তবে এটাকে অনিয়মিত মাসিক বলা হয়৷ যৌবনের প্রারম্ভে বা যৌবনের
শেষ পর্যায়ে এরকম সমস্যা দেখা দেয়৷

কারণ সমূহঃ

স্ত্রী (ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন) হরমোনের ভারসাম্যের অভাবে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল হঠাৎ খাওয়া বন্ধ করলে।
জননাঙ্গের যক্ষা, গণোরিয়া, সিফিলিস, এইডস, ডায়াবেটিস প্রভৃতির কারণে হতে পারে৷
সন্তান প্রসবের পর পরও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মানসিক কারণ।

হঠাত্ অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি।
রক্তস্বল্পতা।

লক্ষণ সমূহঃ

মাসে ২/৩ বার মাসিক বা ঋতুস্রাব হতে পারে।
শুরু হওয়ার ১/২ দিন পরই শেষ হয়ে যায় এবং কয়েকদিন পর আবার শুরু হয়।
একনাগাড়ে অনেকদিন ধরে চলতে পারে।
কোনো কোনো সময় স্বল্পকালীন মাসিক দেখা যায় এবং পরবর্তীতে মাসিক শুরু হলে তা প্রায় ২/৩ মাস পর্যন্ত চলতে থাকে।
রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়া দেখা দিতে পারে।
ক্ষুধামন্দা ও শরীর দুর্বল বোধ হয়।
মেজাজ খিটখিটে ও অশ্বস্তি বোধ।
রুগ্নতা ও সাংসারিক অশান্তি দেখা দিতে পারে৷

জটিলতা সমূহঃ

সন্তান ধারণে অক্ষমতা বা বন্ধ্যাত্ব দেখা যেতে পারে।
অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ হতে পারে।
টিউমার ও ক্যান্সারজনিত হলে সময়মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে মৃত্যুও হতে পারে।

চিকিত্সা সমূহঃ

রোগীকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্রামে থাকতে হবে এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।
মানসিকভাবে আস্বস্ত হতে হবে।
রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে রক্ত দিতে হবে।
পুষ্টিকর খাবার ও হালকা ব্যায়াম করতে হবে।

পরামর্শ সমূহঃ

এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অস্থির না হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে৷
রোগীকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করতে হবে৷

ঈমান

ঈমান

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
সুপ্রিয় বন্ধুগণ, আমরা জানি, তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ হলমুসলিম জীবনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতে কোন ত্রুটি থাকলে ইসলামে সবচেয়ে মৌলিক বিষয়েই খুত সৃষ্টি হয়। তাই এ বিষয়টি সব চেয়ে বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সর্ব প্রথম আবশ্যক হল তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। অনুরূপভাবে শিরক এর ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলার অপেক্ষা রাখে না। যা হোক আলোচ্য বইযে সমুহে তাওহীদ এবং শিরক এর প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয় সমূহ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
দয়া করে পিডিএফ ফাইল গুলো ডাউনলোড করে নিন।
তাওহীদ শিক্ষা তাওহীদের মর্মকথা তাওহীদ জিগাসা-১ তাওহীদ
তাওহীদ এবং কালিমা তাওহীদ এবং শিরক তাওহীদের কিশতী তাওহীদের গুরুতপূর্ণ বিষয়



আল্লাহ্ বলেন وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا
“আল্লাহর অনেক সুন্দর সুন্দর নাম আছে, সেই নামের মাধ্যমে তোমরা তাঁকে ডাক। (সূরা আরাফঃ ১৮০)
আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
إِنَّ لِلَّهِ تَعَالَى تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إلاَّ واَحِداً مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
“আল্লাহ তায়ালার এমন নিরানব্বইটি (এক কম একশ) নাম রয়েছে, যে উহা গণনা করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বুখারী ও মুসলিম)
হাদীছে যে বলা হয়েছে: “যে ব্যক্তি উহা গণনা করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” এর অর্থ হচ্ছে:
(১) শব্দ ও সংখ্যা সমূহ গণনা করা।
(২) উহার অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করা, তার প্রতি ঈমান রাখা ও সে অনুযায়ী আমল করা। যেমন: الْحَكِيمُ মহা বিজ্ঞ। বান্দা যখন নিজের যাবতীয় বিষয় তাঁর কাছে সমর্পণ করবে তখনই এ নামের উপর আমল হবে। কেননা সকল বিষয় তাঁরই হেকমত ও পাণ্ডিত্যেই হয়ে থাকে। বান্দা যখন বলবে الْقُدُّوسُ বা মহা পবিত্র, তখন অন্তরে অনুভব করবে যে, তিনি যাবতীয় দোষ-ত্র“টি থেকে পূত পবিত্র।
(৩) নামসমূহ উল্লেখ করে দুআ করা। এ দুআ দুপ্রকারঃ (ক) প্রশংসা ও ইবাদতের দুআ (খ) প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা।
কুরআন ও সুন্নাহ্ অনুসন্ধান করে আল্লাহর যে সমস্ত নাম জানা যায় তা নিম্নরূপ:
আল্লাহরনাম সমূহ
নামের ব্যাখ্যা
الله
( আল্লাহ)আল্লাহ্‌। তিনি সৃষ্টিকুলের ইবাদত ও দাসত্বের অধিকারী। তিনিই মাবূদ-উপাস্য, তাঁরকাছে বিনীত হতে হয়, রুকূ-সিজদাসহ যাবতীয় ইবাদত-উপাসনা তাঁকেই নিবেদন করতে হয়।
الرَّحْمَنُ
(আর রাহমান)পরম দয়ালু, সৃষ্টির সকলের প্রতি ব্যাপক ও প্রশস্ত দয়ার অর্থবোধক নাম। এ নামটিআল্লাহর জন্যে সবিশেষ, তিনি ব্যতীত কাউকে রহমান বলা জায়েয নয়।
الرَّحِيمُ
(আর রাহীম)পরম করুণাময়, তিনি মুমিনদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষমাকারী করুণাকারী, তাঁরইবাদতের প্রতি মুমিনদের হেদায়াত করেছেন। জান্নাত দিয়ে আখেরাতে তাদেরকে সম্মানিতকরবেন।
العَفُوُ
আল আফুউ) ক্ষমাকারী, তিনি বান্দার গুনাহ মিটিয়ে দেন তাকে ক্ষমা করে দেন, অপরাধ করে শাস্তিযোগ্য হওয়া সত্বেও তিনি শাস্তি দেন না।
الغَفُوْرُ
(আল গাফূর) মহাক্ষমাশীল, তিনি বান্দার অন্যায় গোপন রাখেন, তাকে লাঞ্ছিত করেন না এবং শাস্তিও দেন না।
الْغَفَّارُ
(আল গাফফার) অত্যধিক ক্ষমাকারী, গুনাহগার বান্দা ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন।
الرَّءُوفُ
( আর রাউফ) অতিব দয়ালু, রহমত বা দয়ার সাধারণ অর্থের তুলনায় এ শব্দটি অধিক ও ব্যাপক অর্থবোধক তাঁর এই দয়া দুনিয়াতে সৃষ্টির সকলের জন্যে এবং আখেরাতে কতিপয় মানুষের জন্যে। আর তারা হচ্ছে আল্লাহর বন্ধু মুমিনগণ।
الحَلِيمُ
(আল হালীম) মহাসহিষ্ণু, তিনি বান্দাদেরকে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেন না; অথচ তিনি শাস্তি দিতে সক্ষম। বরং তারা মাফ চাইলে তিনি তাদেরকে মাফ করে দেন।
التَّوَّابُ
(আত তাওয়াব) তওবা কবূলকারী, তিনি বান্দাদের মধ্যে যাকে চান তওবা করার তাওফীক দেন এবং তাদের তওবা কবূল করেন।
السِّتِّيْرُ
(আসসিত্তীর)[1] দোষ-ত্রুটি গোপনকারী, তিনি বান্দার অন্যায় গোপন রাখেন, সৃষ্টিকুলেরসামনে তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন না। তিনি ভালবাসেন বান্দা নিজের এবং অন্যেরদোষ-ত্রুটি গোপন রাখুক, তাহলে তিনিও তাদের অপরাধ গোপন রাখবেন।
الغَنِيُّ
(আল গানী) ঐশ্বর্যশালী, তিনি সৃষ্টিকুলের কারো মুখাপেক্ষী নন। কেননা তিনি নিজে পরিপূর্ণ, তাঁর গুণাবলী পরিপূর্ণ। সৃষ্টির সকলেই ফকীর, অনুগ্রহ ও সাহায্যের জন্যে তাঁর উপর নির্ভরশীল।
الكَرِيمُ
(আল কারীম) মহা অনুগ্রহশীল, সর্বাধিক কল্যাণকারী, সুমহান দানকারী। যাকে যা চান যেভাবে ইচ্ছা দান করেন। চাইলেও দান করেন, না চাইলেও দান করেন। গুনাহ মাফ করেন, দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন।
الأَكْرَمُ
(আল আকরাম) সর্বাধিক সম্মানিত, সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী, তাতে তাঁর কোন দৃষ্টান্ত নেই। যাবতীয় কল্যাণ তাঁর নিকট থেকেই আসে। নিজ অনুগ্রহে মুমিনদের পুরস্কৃত করবেন। অবাধ্যদের সুযোগ দেন, ন্যায়নিষ্ঠার সাথে তাদের হিসাব নিবেন।
الْوَهَّابُ
(আল ওয়াহহাব) মহান দাতা, বিনিময় ব্যতীত বিনা উদ্দেশ্যেই অত্যধিক দান করেন। না চাইতেও অনুগ্রহ করেন।
الْجَوَادُ
(আল জাওয়াদ) উদার দানশীল, সৃষ্টিকুলকে উদারভাবে অধিক দান ও অনুগ্রহ করেন। তাঁর উদারতা ও অনুগ্রহ বিশেষভাবে মুমিনদের প্রতি বেশী হয়ে থাকে।
الْوَدُودُ
(আল ওয়াদূদ) মহত্তম বন্ধু, তিনি তাঁর মুমিন বন্ধুদের ভালবাসেন, মাগফিরাত ও নেয়ামত দিয়ে তিনি তাদের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করেন। তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাদের আমল কবূল করেন। তাদেরকে পৃথিবীবাসীর কাছেও ভালবাসার পাত্র করেন।
الْمُعْطِي
(আল মু’তী) দানকারী, তাঁর অফুরন্ত ভান্ডার থেকে সৃষ্টিকুলের যাকে চান যা চান প্রদান করেন। তাঁর দানের শ্রেষ্ঠাংশ তাঁর (মুমিন) বন্ধুদের জন্যে হয়ে থাকে। তিনিই সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন ও তাতে আকৃতি প্রদান করেছেন।
الوَاسِعُ
(আল ওয়াসি’) মহা প্রশস্ত, তাঁর গুণাবলী সুপ্রশস্ত। কেউ যথাযথভাবে তাঁর গুণগান গাইতে পারবে না। তাঁর মহত্ব ও রাজত্ব সুবিশাল প্রশস্ত। তাঁর মাগফিরাত ও করুণা সুপ্রশস্ত। দয়া ও অনুগ্রহ সুপ্রশস্ত।
الْمُحْسِِنُ
(আল মুহসিন) মহা অনুগ্রহকারী, তিনি স্বীয় সত্বা, গুণাবলী ও কর্মে অতি উত্তম। তিনি সুন্দরভাবে সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টিকুলের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।
الرازقُ
(আর রাযিক) রিযিকদাতা, তিনি সৃষ্টিকুলের সকলকে রিযিক দিয়ে থাকেন। তিনি জগত সৃষ্টির পূর্বে তাদের রিযিক নির্ধারণ করেছেন। আর পরিপূর্ণরূপে সেই রিযিক তাদের প্রদান করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
الرَّزَّاقُ
(আর রাযযাক) সর্বাধিক রিযিকদাতা, তিনি সৃষ্টিকুলকে অধিকহারে রিযিক দিয়ে থাকেন। তাঁর কাছে প্রার্থনা না করতেই তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করেন। এমনকি অবাধ্যদেরকেও তিনি রিযিক দিয়ে থাকেন।
اللَطِيْفُ
(আল লাত্বীফ) সুক্ষ্ণদর্শী, সকল বিষয়ের সুক্ষ্ণাতিসুক্ষ্ণ জ্ঞান আছে তাঁর কাছে। কোন কিছুই গোপন থাকেনা তাঁর নিকট। তিনি বান্দাদের নিকট এত গোপনীয়ভাবে কল্যাণ ও উপকার পৌঁছিয়ে থাকেন যে তারা ধারণাই করতে পারে না।
الخَبيْرُ
(আল খাবীর) মহাসংবাদ রক্ষক, তিনি যেমন সকল বস্তুর প্রকাশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখেন, অনুরূপভাবে তাঁর জ্ঞান সবকিছুর গোপন ও অপকাশ্য সংবাদকেও বেষ্টন করে আছে।
الْفَتَّاحُ
(আল ফাত্তাহ) উন্মোচনকারী, তিনি তাঁর রাজত্বের ভান্ডার এবং করুণা ও রিযিক থেকে যা ইচ্ছা বান্দাদের জন্যে খুলে দেন। তাঁর জ্ঞান ও হিকমত অনুযায়ীই তিনি তা উন্মুক্ত করে থাকেন।
العَلِيمُ
(আল আ’লীম) মহাজ্ঞানী, তাঁর জ্ঞান বেষ্টন করে আছে যাহের-বাতেন, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাবতীয় বিষয়কে। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন বা লুকায়িত নয়।
البَرُّ
(আল বার) মহাকল্যাণদাতা, তিনি সৃষ্টিকুলকে প্রশস্ত কল্যাণদানকারী। তিনি প্রদান করেন কিন্তু তাঁর দানকে কেউ গণনা করতে পারে না। তিনি নিজ অঙ্গীকারে সত্যবাদী। তিনি বান্দাকে ক্ষমা করেন, তাকে সাহায্য করেন ও রক্ষা করেন। তিনি বান্দার অল্পদানও গ্রহণ করেন এবং তার ছওয়াবকে বৃদ্ধি করতে থাকেন।
الحَكِيْمُ
(আল হাকীম) মহাবিজ্ঞ, তিনি নিজ জ্ঞানে সকল বস্তুকে উপযুক্তভাবে স্থাপন করেন। তাঁর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় কোন ত্রুটি হয় না ভুল হয় না।
الْحَكَمُ
(আল হাকাম) মহাবিচারক, তিনি ন্যায়নিষ্ঠার সাথে সৃষ্টিকুলের বিচার করবেন। কারো প্রতি অত্যাচার করবেন না। তিনিই সম্মানিত কিতাব (সংবিধান) নাযিল করেছেন, যাতে করে উক্ত সংবিধান অনুযায়ী মানুষের মাঝে বিচার কার্য সম্পাদন করা যায়।
الشَّاكِرُ
(আশ শাকির) কৃতজ্ঞতাকারী, যে বান্দা তাঁর আনুগত্য করে ও তাঁর গুণগান গায় তিনি তার প্রশংসা করেন। আমল যত কম হোক না কেন তিনি তাতে প্রতিদান দেন। যারা তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া করে বিনিময়ে তাদের নেয়ামতকে দুনিয়াতে আরো বৃদ্ধি করে দেন এবং পরকালে প্রতিদান বৃদ্ধি করবেন।
الشَّكُورُ
(আশ শাকুর) কৃতজ্ঞতাপ্রিয়, বান্দার সামান্য আমল তাঁর কাছে পবিত্রময়। তিনি তাতে বহুগুণ ছওয়াব প্রদান করেন। বান্দার প্রতি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা করার অর্থ হচ্ছে তার কর্মের প্রতিদান দেয়া এবং আনুগত্য গ্রহণ করা।
الجَمِيْلُ
(আল জামীল) অতিব সুন্দর, তিনি নিজ সত্বা, নাম ও গুণাবলীতে এবং কর্মে অতিব সুন্দর। সৃষ্টির যে কোন সৌন্দর্য তাঁর পক্ষ থেকেই প্রদত্ত।
الْمَجِيدُ
(আল মাজীদ) মহাগৌরবান্বিত সপ্তাকাশে ও পৃথিবীতে গর্ব ও অহংকার, সম্মান ও মর্যাদা এবং উচ্চতা ও শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র তাঁরই।
الْوَلِيُّ
(আল ওয়ালী) মহা অভিভাবক, তিনি সৃষ্টি জগতের প্রতিটি বিষয়ের পরিচালনাকারী, রাজত্বে কর্তৃত্বকারী। তিনিই তাঁর মুমিন বন্ধুদের সাহায্যকারী, মদদকারী ও রক্ষাকারী।
الْحَمِيدُ
(আল হামীদ) মহাপ্রশংসিত, তিনি নিজ নাম, গুণাবলী ও কর্মে সর্বোচ্চ প্রশংসিত। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও সচ্ছলতা-অভাবে তাঁরই প্রশংসা। তিনিই সকল প্রশংসা ও স্তুতির হকদার। কেননা তিনি সকল পরিপূর্ণ গুণাবলীর অধিকারী।
المَوْلَى
(আল মাওলা) অভিভাবক, তিনি পালনকর্তা, বাদশা, নেতা। তিনি তাঁর মুমিন বন্ধুদের সাহায্য ও সহযোগিতাকারী।
النَّصِيْرُ
(আন নাসীর) সাহায্যকারী, তিনি যাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। তিনি যাকে মদদ করেন তাকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। তিনি যাকে লাঞ্ছিত করেন তাকে কেউ সাহায্য করতে পারে না।
السَّمِيعُ
মহাশ্রবণকারী, তাঁর শ্রবণ প্রত্যেক গোপনীয় সলা-পরামর্শকে বেষ্টন করে, প্রত্যেক প্রকাশ্য বিষয়কে বেষ্টন করে; বরং সকল আওয়াজকে বেষ্টন করে তা যতই উঁচু হোক অথবা নীচু বা ক্ষীণ হোক।
البَصِيرُ
(আল বাসীর) মহাদ্রষ্টা, তাঁর দৃষ্টি জগতের সকল কিছুকে বেষ্টন করে আছে। দৃশ্য-অদৃশ্য সকল কিছুই তিনি দেখতে পান। যতই গোপন বা প্রকাশ্য হোক না কেন অথবা ক্ষুদ্র ও বৃহৎ হোক না কেন তাঁর অগোচরে কিছুই থাকে না।
الشَّهِيدُ
(আশ শাহীদ) মহাস্বাক্ষী, তিনি সৃষ্টিকুলের পর্যবেক্ষক। তিনি নিজের একত্ববাদ ও ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার স্বাক্ষ্য দিয়েছেন। মুমিনগণ তাঁর একত্ববাদ ঘোষণা করলে তিনি তাদের স্বাক্ষী হন। তিনি তাঁর রাসূলগণ এবং ফেরেশতাদের জন্যেও স্বাক্ষী|
الرَّقِيبُ
(আর রাক্বীব) মহাপর্যবেক্ষক, তিনি সৃষ্টিকুলের সবকিছুই জানেন। তিনি তাদের কর্ম সমূহ গণনা করে রাখেন। কারো চোখের পলক বা অন্তরের গোপন বাসনা তাঁর জ্ঞান বহির্ভূত নয়।
الرَّفِيْقُ
(আর রাফীক্ব) মহান বন্ধু, দয়ালু, তিনি নিজের কর্মে খুব বেশী নম্রতা অবলম্বন করেন। তিনি সৃষ্টি ও নির্দেশের বিষয় ক্রমান্বয়েও ধীরস্থীরভাবে সম্পন্ন করেন। তিনি বান্দাদের সাথে কোমল ও দয়ালু আচরণ করেন। সাধ্যের বাইরে তাদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেন না। তিনি নম্র-ভদ্র বান্দাকে ভালবাসেন।
القَرِيْبُ
(আল ক্বরীব) সর্বাধিক নিকটবর্তী, তিনি জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সৃষ্টির নিকটবর্তী। সাহায্য ও দয়ার মাধ্যমে মুমিন বন্দাদের নিকটবর্তী। সেই সাথে তিনি সপ্তাকাশের উপর সুমহান আরশে সমুন্নত। তিনি স্বসত্বায় মাখলুকের সাথে মিশে থাকেন না।
المُجِيبُ
(আল মুজীব) কবূলকারী, আহবানে সাড়াদানকারী, তিনি আহবানকারীর আহবানে এবং প্রার্থনকারীর প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে থাকেন। তাঁর জ্ঞান ও হিকমত অনুযায়ীই তিনি সাড়া দিয়ে থাকেন।
الْمُقِيْتُ
(আল মুক্বীত) ভরণ-পোষণ দানকারী, খাদ্যদাতা, তিনি রিযিক ও খাদ্য সৃষ্টি করেছেন এবং তা মাখলুকের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বও নিয়েছেন। তিনি বান্দার রিযিক ও আমল লোকসান ও ত্রুটি ছাড়াই সংরক্ষণ করেন।
الْحَسِيبُ
(আল হাসীব) মহান হিসাব রক্ষক, যথেষ্ট, বান্দার দ্বীন-দুনিয়ার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্যে তিনিই যথেষ্ট। তাঁর যথেষ্টতার শ্রেষ্ঠাংশ মুমিনদের জন্যে নির্ধারিত। মানুষ দুনিয়ায় যে আমল সম্পাদন করেছে তিনি তার হিসাব নিবেন।
المُؤْمِنُ
(আল মু’মিন) নিরাপত্তাদানকারী, বিশ্বাসী, নবী-রাসূল এবং তাঁদের অনুসারীদের সত্যতার সাক্ষী দিয়ে তিনি তাদের সত্যায়ন করেছেন। তাঁদের সত্যতাকে বাস্তবায়ন করার জন্যে যে দলীল-প্রমাণ দিয়েছেন তার সত্যায়ন করেছেন। দুনিয়া-আখেরাতের সকল নিরাপত্তা তাঁরই দান। মুমিনদের নিরাপত্তা দিয়েছেন যে, তিনি তাদের প্রতি যুলুম করবেন না, তাদেরকে শাস্তি দিবেন না এবং কিয়ামতের বিভীষিকাময় অবস্থায় তাদেরকে বিপদে ফেলবেন না।
الْمَنَّانُ
(আল মান্নান) অনুগ্রহকারী, দানকারী, তিনি অঢেল দান করেন, বড় বড় নেয়ামত প্রদান করেন। সৃষ্টির উপর পরিপূর্ণরূপে অনুগ্রহ করেন।
الطَّيِّبُ
(আত ত্বইয়েব) মহা পবিত্র, তিনি অতি পবিত্র, যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। যাবতীয় সৌন্দর্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও পরিপূর্ণতা তাঁরই। তিনি সৃষ্টিকুলকে অফুরন্ত কল্যাণ প্রদান করেন। আমল ও দান-সাদকা একনিষ্ঠভাবে তাঁর উদ্দেশ্যে না হলে এবং হালাল ও পবিত্র উপার্জন থেকে না হলে তিনি তা কবূল করবেন না।
الشَّافِي
(আশ শাফী) আরোগ্য দানকারী, তিনি অন্তর ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের যাবতীয় ব্যাধির আরোগ্য দানকারী। আল্লাহ্‌ যা দিয়েছেন তা ব্যতীত বান্দার হাতে কোন নিরাময়ক উপকরণ নেই। আরোগ্য বা রোগমুক্তির ক্ষমতা একমাত্র তাঁর হাতেই আছে।
الْحَفِيظُ
(আল হাফীয) মহারক্ষক, তিনি নিজ অনুগ্রহে মুমিন বান্দার আমল সমূহ হেফাযত ও সংরক্ষণ করে থাকেন। তাঁর অসীম ক্ষমতা দ্বারা মাখলুকাতকে লালন-পালন করেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
الْوَكِيلُ
(আল ওয়াকীল) মহা প্রতিনিধি, তিনি সমস্ত জগতের দায়িত্ব নিয়েছেন, সৃষ্টি ও পরিচালনার কর্তব্যভার গ্রহণ করেছেন। অতএব সৃষ্টিকুলকে অস্তিত্ব প্রদান ও মদদ করার তিনিই যিম্মাদার।
الْخَلاَّقُ
(আল খাল্লাক্ব) সৃষ্টিকারী, আল্লাহ্‌ তাআলা যে অগণিত বস্তু সৃষ্টি করেন শব্দটি তার অর্থই বহণ করছে। তিনি সৃষ্টি করতেই আছেন এবং সৃষ্টি করার এই বিশাল ক্ষমতা তাঁর মধ্যে চিরকালীন।
الخَالِقُ
(আল খালিক্ব) স্রষ্টা, তিনি পূর্ব দৃষ্টান্ত ছাড়াই মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেছেন।
البَارِئُ
(আল বারী) সৃজনকর্তা, তিনি যা নির্ধারণ করেছেন এবং যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে রূপ দান করেছেন।
المُصَوِّرُ
(আল মুসাব্বির) অবয়বদানকারী, আল্লাহ্‌ তা’আলা নিজের প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও করুণা অনুযায়ী সৃষ্টিকুলকে ইচ্ছামত আকৃতি ও অবয়ব দান করেছেন।
الرَّبُّ
(আর রব) প্রভু, প্রতিপালক, তিনিই সৃষ্টিকুলকে তাঁর নেয়ামতরাজী দিয়ে প্রতিপালন করেন, তাদেরকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন। তিনি মুমিন বন্ধুদের অন্তর যেভাবে সংশোধন হয় সেভাবে যত্নসহকারে লালন-পালন করেন। তিনিই মালিক, স্রষ্টা, নেতা ও পরিচালক।
العَظِيمُ
(আল আযীম) সুমহান, তিনি নিজ সত্বা, নাম ও গুণাবলীতে সুমহান গৌরবান্বিত। তাই সৃষ্টিকুলের আবশ্যক হচ্ছে তাঁর মহত্ব ঘোষণা করা, তাঁকে সম্মান করা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তা মেনে চলা।
القَاهِرُ/ القَهَّارُ
(আল কাহির/আল কাহ্হার) পরাজিতকারী, অসীম ক্ষমতাবান, তিনি বান্দাদেরকে বাধ্যকারী, সৃষ্টিকুলেকে তাঁর দাসে পরিণতকারী, সকলের উপর সর্বোচ্চ। তিনিই বিজয়ী, তাঁর জন্যেই সকল মস্তক নত হয়, সব মুখমন্ডল অবনমিত হয়।
المُهَيْمِنُ
(আল মুহাইমিন) রক্ষক, কর্তৃত্বকারী, তিনি সকল বস্তুকে পরিচালনাকারী, সংরক্ষণকারী, সাক্ষী এবং সব কিছুকে বেষ্টনকারী।
العَزِيزُ
(আল আযীয) মহাপরাক্রমশালী, ক্ষমতা ও শক্তির যাবতীয় বিষয় তাঁরই অধিকারে। তিনি প্রতাপশালী- তাঁকে কেউ পারজিত করতে পারে না। তিনি বাধাদানকারী- তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, কর্তৃত্ব ও বিজয় তাঁর হাতেই- তাঁর অনুমতি ছাড়া কোন কিছুই নড়তে পারে না।
الجَبَّارُ
(আল জাব্বার) মহাশক্তিধর, তিনি যা চান তাই হয়, সৃষ্টিকুল তাঁর কাছে পরাজিত, তাঁর মহত্বের কাছে অবনমিত, তাঁর হুকুমের গোলাম। তিনি ব্যাথাতুর ভগ্নের সহায়তা করেন, অভাবীকে স্বচ্ছল করেন, কঠিনকে সহজ করেন, অসুস্থ ও বিপদাপন্নকে উদ্ধার করেন।
المُتَكَبِّرُ
(আল মুতাকাব্বির) মহাগৌরবান্বিাত তিনি মহান, সকল দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে। তিনি বান্দাদের প্রতি অত্যাচারের অনেক উর্ধ্বে। সৃষ্টির অবাধ্যদেরকে পরাজিতকারী। গর্ব-অহংকারের একক অধিকারী তিনিই।
الكَبيرُ
(আল কাবীর) অতীব মহান, তিনি নিজ সত্বা, গুণাবলী ও কর্মে অতিব মহান ও বড়। তাঁর চেয়ে বড় কোন বস্তু নেই। তাঁর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের সামনে সব কিছুই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ।
الحَيـِِيُّ
(আল হায়িই) লজ্জাশীল, তাঁর সম্মানিত সত্বা ও বিশাল রাজত্বের সাথে সামঞ্জস্যশীল পন্থায় তিনি লজ্জা করেন। আল্লাহর লজ্জা হচ্ছে তাঁর দান, করুণা, উদারতা ও সম্মান।
الحَيُّ
(আল হাই) চিরঞ্জীব, তিনি চিরকাল পরিপূর্ণরূপে জীবিত। তিনি এভাবেই ছিলেন ও আছেন এবং থাকবেন। তাঁর শুরু নেই বা শেষ নেই। জগতে প্রাণের যে অস্তিত্ব তা তাঁরই দান।
القَيُّومُ
(আল কাইয়ূম) চিরস্থায়ী, তিনি নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠিত, তিনি সৃষ্টিকুলের কারো মুখাপেক্ষী নন। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে তার সবকিছুই তাঁর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সবাই তাঁর দরবারের ভিক্ষুক।
الْوَارِثُ
(আল ওয়ারিস) উত্তরাধিকারী, সৃষ্টিকুল ধ্বংস হওয়ার পর তিনিই থাকবেন, প্রত্যেক বস্তুর মালিক ধ্বংস হওয়ার পর তা তাঁর কাছেই ফিরে যাবে। আমাদের কাছে যা কিছু আছে তা আমানত স্বরপ আল্লাহ্‌ দিয়েছেন। এগুলো সবই প্রকৃত মালিক আল্লাহর কাছে একদিন ফিরে যাবে।
الدَّيْانُ
(আদ দাইয়ান) মহাবিচারক, তিনি সেই সত্বা সৃষ্টিকুল যাঁর অনুগত ও অবনমিত। তিনি বান্দাদের কর্মের বিচার করবেন। ভাল কর্মে বহুগুণ প্রতিদান দিবেন। মন্দ কর্মে শাস্তি দিবেন অথবা তা ক্ষমা করে দিবেন।
المَلِكُ
(আল মালিক) মহান মালিক, বাদশা, আদেশ-নিষেধ ও কর্তৃত্বের অধিকারী তিনিই। তিনি আদেশ ও কর্মের মাধ্যমে সৃষ্টিকুলকে পরিচালনাকারী। তাঁর রাজত্ব ও পরিচালনায় তাঁর কোন শরীক নেই।
الْمَالِكُ
আল (মালিক) মহান মালিক, তিনি মূলে সব কিছুর মালিক এবং মালিকানার যোগ্যও একমাত্র তিনিই। জগত পয়দা করার সময় তিনিই মালিক, তিনি ব্যতীত কেউ ছিলনা। সবশেষে সৃষ্টিকুল ধ্বংস হওয়ার পরও মালিকানা তাঁরই।
الْمَلِيْكُ
(আল মালীক) মহান বাদশা, ব্যাপকভাবে মালিকানা ও কর্তৃত্ব তাঁরই।
السُّبُّوْحُ
(আস সুব্বূহ) মহামহিম, পূতপবিত্র, তিনি সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র। কেননা পরিপূর্ণতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্যের যাবতীয় গুণাবলী তাঁরই।
القُدُّوسُ
(আল ক্বুদ্দূস) মহা পবিত্র, তিনি সবধরণের ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও নিঃষ্কলুষ। কারণ পূর্ণতা বলতে যা বুঝায় এককভাবে তিনিই তার উপযুক্ত, তাঁর কোন দৃষ্টান্ত নেই।
السَّلامُ
(আস সালাম) পরম শান্তিদাতা, তিনি স্বীয় সত্বা, নাম, গুণাবলী ও কর্মে যে কোন ধরণের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় শান্তি-শৃংখলা একমাত্র তাঁর নিকট থেকেই পাওয়া যায়।
الحَقُّ
(আল হাক্ক) মহাসত্য, তাঁর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই সংশয় নেই- না তাঁর নাম ও গুণাবলীতে না তাঁর উলুহিয়্যাতে। তিনিই সত্য মা’বূদ- তিনি ব্যতীত কোন মা’বূদ সত্য নয়।
المُبيْنُ
(আল মুবীন) সুস্পষ্টকারী, প্রকাশকারী, তাঁর একত্ববাদ, হিকমত ও রহমতের প্রতিটি বিষয় প্রকাশ্য। তিনি বান্দাদেরকে কল্যাণ ও হেদায়াতের পথ পরিস্কার বাতলিয়ে দিয়েছেন, যাতে তারা তার অনুসরণ করে এবং বিভ্রান্তি ও ধ্বংসের পথও সুস্পষ্ট বর্ণনা করেছেন, যাতে তারা সতর্ক থাকতে পারে।
القَويُّ
(আল ক্বাবী)মহা শক্তিধর, তিনি পরিপূর্ণ ইচ্ছা-স্বাধিনতার সাথে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী।
المَتِيْنُ
(আল মাতীন) দৃঢ়শক্তির অধিকারী, তিনি নিজ ক্ষমতা ও শক্তিতে অত্যন্ত কঠোর। কোন কাজে কষ্ট-ক্লেশ বা ক্লান্তি তাঁকে আচ্ছন্ন করে না।
الْقَادِرُ
(আল ক্বাদির) সর্বশক্তিমান, তিনি সকল বস্তুর উপর শক্তিমান, কোন কিছুই তাঁকে আপরাগ করতে পারে না- না যমীনে না আসমানে। তিনিই সব কিছু নির্ধারণ করেছেন।
القَدِيْرُ
(আল ক্বাদীর) মহাপ্রতাপশালী, এ শব্দটির অর্থ পূর্বের শব্দটিরই অনুরূপ। কিন্তু আল্‌ কাদীর শব্দটির মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা অধিক হয়।
الْمُقْتَدِرُ
(আল মুক্তাদির) মহা ক্ষমতাবান, আল্লাহর পূর্ব জ্ঞান অনুযায়ী নির্ধারণকৃত বস্তু বাস্তবায়নে ও সৃষ্টি করতে তাঁর অতিরিক্ত ক্ষমতা আছে।
العليُّ الأَعْلَى
(আল আলিউল আ’লা) সুউচ্চ, মহান, মহত্তর, সর্বোচ্চ, তিনি মর্যাদা, ক্ষমতা ও সত্বা তথা সকল দিক থেকে সর্বোচ্চ। সব কিছুই তাঁর রাজত্ব ও ক্ষমতার অধিনে। তাঁর উপরে কখনোই কিছু নেই।
المُتَعَالُ
(আল মু’তাল) চিরউন্নত, তাঁর উচ্চতা ও মহত্বের সামনে সকল বস্তু অবনমিত। তাঁর উপরে কিছু নেই। সকল বস্তু তাঁর নীচে ও অধীনে, তাঁর ক্ষমতা ও রাজত্বের বলয়ে।
الْمُقَدِّمُ
(আল মুক্বাদ্দিম) অগ্রসরকারী, তিনি নিজের ইচ্ছা ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সকল বস্তুকে বিন্যস্ত করেছেন ও স্বস্থানে রেখেছেন। তাঁর জ্ঞান ও অনুগ্রহের ভিত্তিতে সৃষ্টির কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
الْمُؤَخِّرُ
(আল মুআখখির) পশ্চাতে প্রেরণকারী, তিনি প্রতিটি বস্তুকে নিজের হিকমত অনুযায়ী যেভাবে ইচ্ছা স্থাপন করেন, যাকে ইচ্ছা অগ্রসর করেন, যাকে ইচ্ছা পশ্চাতে রাখেন। পাপী বান্দাদেরকে শাস্তি দিতে দেরী করেন, যাতে তারা তাওবা করতে পারে আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে পারে।
الْمُسَعِّرُ
(আলমুসায়্যি’র)[2] মূল্য নির্ধারণকারী, তিনি নিজের প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের দাবী অনুযায়ীবিভিন্ন বস্তুর মূল্য, মর্যাদা, গুরুত্ব ও প্রভাবকে বৃদ্ধি করেন অথবাহ্রাস করেন। ফলে উহা মূল্যবান (মহার্ঘ) হয় অথবা সস্তা হয়।
الْقَابِضُ
(আল কাবিয) কবজকারী, সংকুচনকারী, তিনিই প্রাণীকুলের জান কবজ করেন। তিনি নিজের হিকমত ও ক্ষমতা বলে সৃষ্টিকুলের মধ্যে যার ইচ্ছা রিযিক সংকুচন ও হ্রাস করেন- তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে।
الْبَاسِطُ
(আল বাসিত্ব) সমপ্রসারণকারী, তিনি তাঁর উদারতা ও করুণায় বান্দাদের রিযিক প্রশস্ত করেন। অতঃপর তাঁর হিকমত অনুযায়ী তা দ্বারা তাদের পরীক্ষা করেন। তিনি গুনাহগারদের তাওবা কবূল করার জন্যে দু’হস্ত প্রসারিত করেন।
الأَوَّلُ
(আল আওয়াল) অনাদী, তিনি সেই সত্বা যাঁর পূর্বে কিছুই ছিল না। তিনি সৃষ্টি করেছেন বলেই মাখলুক অস্তিত্ব লাভ করেছে। কিন্তু তাঁর অস্তিত্বের কোন শুরু নেই।
الآخِرُ
(আল আখির) অনন্ত, তাঁর পর কোন কিছু নেই। তিনিই অনন্ত, চিরকালীন ও অবিশষ্ট। পৃথিবীর সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে; অতঃপর প্রত্যাবর্তন করবে তাঁর কাছেই। কিন্তু তাঁর অস্তিত্বের শেষ নেই।
الظَّاهِرُ
(আয যাহির) প্রকাশ্য, তিনি সবকিছুর উপরে সুউচ্চ। তাঁর উচ্ছে কিছু নেই। তিনি সকল বস্তুকে করায়ত্বকারী ও বেষ্টনকারী।
البَاطِنُ
(আল বাত্বিন) গোপন, তাঁর পরে কোন কিছু নেই। তিনি দুনিয়াতে মাখলুকের দৃষ্টির আড়ালে থাকেন; তারপরও তিনি তাদের নিকটবর্তী ও তাদেরকে বেষ্টনকারী।
الوِتْرُ
(আল বিতর) বেজোড় বা একক, তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি অদ্বিতীয় তাঁর কোন নযীর নেই।
السَّيِّدُ
(আস সাইয়েদ) প্রভু, নেতা, মানুষের অভাব পুরণকারী, সৃষ্টিকুলের একক নেতৃত্ব তাঁর হাতেই। তিনি তাদের মালিক ও পালনকর্তা। সবকিছু তাঁর সৃষ্টি ও দাস।
الصَّمَدُ
(আস সামাদ) অমুখাপেক্ষী, স্বয়ং সম্পূর্ণ, তিনি নিজের নেতৃত্বে স্বয়ং সম্পূর্ণ, | মাখলুকাত যাবতীয় প্রয়োজনে তাঁরই স্মরণাপন্ন হয়। কেননা তারা তাঁর কাছে বড়ই নি:স্ব তিনি সবার আহার যোগান; তাকে কেউ আহার দেয় না, তাঁর আহারের কোন দরকার নেই।
الوَاحِدُ الأَحَدُ
(আল ওয়াহিদুল আহাদ) একক, অদ্বীতিয়, সকল ক্ষেত্রে পরিপূর্ণতায় তিনিই একক ও অদ্বিতীয়; তাঁর কোন অংশী নেই। তাঁর অনুরূপ কোন কিছু নেই। এই গুণাবলী এককভাবে তাঁরই ইবাদতকে আবশ্যক করছে। তাঁর কোন শরীক নেই।
الإِلَهُ
(আল ইলাহ) মা’বূদ বা উপাস্য, তিনিই সত্য মাবূদ। এককভাবে তিনি যাবতীয় ইবাদত ও দাসত্ব পাওয়ার হকদার; অন্য কেউ নয়।
সংকলনে: শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী
জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার
সৌদী আরব।
(তাফসীরুল উশরুর আখীর কিতাব থেকে সংকলিত)
[1] উল্লেখ্য যে, আস সাত্তার বা আস সাতির নামটি হাদীসে পাওয়া যায় না। তবে সিত্তীর নামটি হাদীসে উল্লেখি হয়েছে। যেমন:
روى أحمد وأبو داود والنسائي عن يعلى بن أمية أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: “إن الله حيي ستير يحب الحياء والستر” وصححه الألباني
ইয়ালা বিন উমাইয়া (রা.)থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ লজ্জাশীল দোষত্রুটি গোপনকারী। তিনি লজ্জাশীলতাকে এবং মানুষের দোষত্রুটিকে গোপন করাকে ভালবাসেন। আবু দাউদ, নাসাই, আল্লামা আলবানী (রাহ:) বলেন: হাদীসটি সহীহ)
[2] এ নামটির ব্যাপারে ওলামাগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তবে একদল আলেমের মতে এটি আল্লাহর নামের অন্তর্ভূক্ত।
দয়া করে লিঙ্কটা সবার সাথে শেয়ার করে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল হাসেল করুন। আল্লাহ আপনার উপর রহমত বর্ষণ করুন।